kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

আলাল থেকে ‘আলাদিন’

দলীয় পদ ছাড়াই দুর্গাপুর পৌরসভা নির্বাচনে আ. লীগের মেয়র প্রার্থী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আলাল থেকে ‘আলাদিন’

পাঁচ টাকার রুটি-ভাজি আর এক কাপ চা ছিল সকালের নাশতা। প্রতিদিন এটুকুও যার চেয়ে খেতে হতো সেই আলাল এখন শতকোটি টাকার মালিক। বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন। ময়মনসিংহ শহরে আছে চার-পাঁচটি ফ্ল্যাট, দুর্গাপুরে কোটি টাকার জমি, নামে-বেনামে কোটি টাকার ব্যবসা। বাস্তবে তিনি বালুমহালের ইজারাদার মো. আলাল উদ্দিন।

সেই আলাল এখন হতে চলেছেন দুর্গাপুর পৌরসভার মেয়র। আগামী শনিবার ভোটে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী। তাঁর মনোনয়ন নিয়ে এলাকায় চলছে সমালোচনার ঝড়।

হলফনামায় তথ্য গোপন : নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় আলাল তাঁর সম্পদের সঠিক তথ্য তুলে ধরেননি। দুর্গাপুরের যেসব জমির উল্লেখ নেই (১) ১৭৪৮ দাগের ১২ শতাংশ। (২) ৪৮৬৪ নতুন দাগের ৫.২২ শতাংশ যৌথ মালিকানা। (৩) ময়মনসিংহ শহরে সাততলা ভবনের কথা উল্লেখ থাকলেও এটি মূলত আটতলা। (৪) ময়মনসিংহের জুবলী ঘাটে আরিফ টাইলস নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। যা তাঁর ছেলে আরিফ পরিচালনা করেন। ভবনের মালিক আলাল। (৫) দুর্গাপুর পৌরসভার বাইরে স্বর্ণা ব্রিকস।

আলাল হলফনামায় নগদ দুই লাখ টাকা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৮৬ টাকা আছে বলে উল্লেখ করেছেন। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকে গত ২ নভেম্বর ২০২০ থেকে ডিসেম্বর ২৮ পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে পাঁচ কোটি ২০ লাখ টাকা। দুটি এফডিআর ভেঙেছেন এক কোটি করে দুই কোটি টাকা।

পরিচয় : আলাল (৫৬) সাবেক কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মৃত আলী হোসেনের ছেলে। তাঁর বাবা স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ হন। চার ভাইয়ের মধ্যে আলাল সবার ছোট। বড় বোন মরহুমা জহুরা বেগম প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জালাল উদ্দিন তালুকদারের স্ত্রী। জালাল হত্যা মামলার আসামি তাঁর আরেক বোন আয়েশা খানম। আলাল দুর্গাপুর এমকেসিএম (মহারাজা কুমুদ চন্দ্র মেমোরিয়াল) উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণি পাস। একসময় পৈতৃক সহায়-সম্পত্তি বেচে স্থানীয় সংসদ সদস্য ভগ্নিপতির বাড়িতে স্থান হয় তাঁর। কর্মহীন জীবনে ভগ্নিপতির জমিজমা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেখাশোনা ছিল একমাত্র অবলম্বন। কাঠের ব্যবসা, ঠিকাদারিতে চলত সংসার। বিয়ে করেছেন দুটি।

উত্থান : সাত লাখ টাকায় কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে আলালের বালু ব্যবসা শুরু। ১৪২৫ বঙ্গাব্দে একজন সংসদ সদস্যের সহায়তায় বালুমহাল ইজারা পান। ‘স্বপন এন্টারপ্রাইজ’ নামে রূপন সাহার লাইসেন্সে দুর্গাপুর ২ নম্বর বালুঘাট ও ‘আরিফ এন্টারপ্রাইজ’ নামে নিজ লাইসেন্সে দুর্গাপুর ৩ নম্বর বালুঘাট ইজারা নেন। পরবর্তী সময়ে ১ নম্বর বালুমহালও চলে আসে তাঁর হাতে। চতুরভাবে অংশীদারদের সরিয়ে সব নিয়ন্ত্রণ নেন। শুরু হয় অবৈধভাবে সোমেশ্বরী নদীর বালু উত্তোলন। উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রসাশন (রাজস্ব) শাখা, সংসদ সদস্যের প্রতিনিধিকে ম্যানেজ করে প্রতিদিন তিনটি ঘাট থেকে আলালের হাতে আসতে থাকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা।

আলালের বক্তব্য : রাজনীতিতে সক্রিয় বা পদ-পদবি ছাড়াই কিভাবে মেয়র পদে মনোনয়ন পেলেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে আলাল বলেন, ‘নেত্রী আমার বিষয়ে জেনে মনোনয়ন দিয়েছেন। আমি কৃতজ্ঞ।’ হলফনামায় মিথ্যা তথ্য এবং অন্যান্য অভিযোগ নিয়ে তিনি কোনো কথা বলতে চাননি।

স্থানীয়রা কী বলে? দুর্গাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘আলাল আওয়ামী পরিবারের সদস্য। এসব বিবেচনায় দল মনোনয়ন দিয়েছে।’

দুর্গাপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আলাল ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কুপনের (১০ টাকার ফরম পূরণ করে যে কেউ এটা হতে পারেন) প্রাথমিক সদস্য। দলীয় পদ ছাড়া সবাইকে তাক লাগিয়ে নৌকার মনোনয়ন ছিনিয়ে এনেছেন তিনি।’ বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে রাজ্জাক জানান, কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডে আলাল জীবনবৃত্তান্তে সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য, সাবেক কোষাধ্যক্ষ উপজেলা যুবলীগ ও সাবেক সদস্য উপজেলা যুবলীগ হিসেবে মিথ্যা দাবি করেছেন।

দুর্গাপুর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান মেয়র আবদুস ছালাম বলেন, ‘আলাল স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। কিভাবে মনোনয়ন পেলেন, তা আমার বোধগম্য নয়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা