kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ডিগবাজির নৌকায় ত্যাগীরা শঙ্কায়

রফিকুল ইসলাম ও আজিম হোসেন, বরিশাল   

২৫ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডিগবাজির নৌকায় ত্যাগীরা শঙ্কায়

১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট জাতির জনকের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের মো. সেলিম ওরফে আব্দুল। ’৭১-এ বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে গৃহবন্দিও ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তিনি প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত তাঁদের বসতঘর ভাঙচুর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। একই সঙ্গে তাঁর ছোট ভাই কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেনের ওপর হামলা চালান বিএনপি নেতা শাহ মোহাম্মদ আবুল হোসেনের সহযোগী আব্দুল হালিম মিলন চৌধুরী।

১/১১-এর (২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি) পর ঢাকায় পাড়ি জমান মিলন। হঠাৎ করে এক যুগ পর মেঘনা তীরবর্তী মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া ইউনিয়নে ফিরেছেন মিলন। তাও আবার তাঁর নির্যাতনের শিকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতীক নৌকার প্রার্থী হয়ে।

আগামী ১০ ডিসেম্বর উলানিয়া দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে লড়াই করবেন সাবেক এই বিএনপি নেতা। মিলনের বাবা আব্দুল হাই হিরু চৌধুরী উলানিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি। তাঁর মেজো ভাই মিটন চৌধুরী উলানিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। সেজো ভাই রিপন চৌধুরী উলানিয়া ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। ছোট ভাই লিখন চৌধুরী উলানিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।

আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সদ্যঃপ্রয়াত ইউপি চেয়ারম্যান আলতাফ সরদারের স্ত্রী রুমা বেগম। তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তৃণমূল আওয়ামী লীগ তাঁকে সমর্থন দিয়েছে। আর যিনি মনোনয়ন পেয়েছেন সেই মিলন আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের প্রস্তাবিত তালিকায়ই ছিলেন না।

একই অবস্থা উলানিয়া উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নুরুল ইসলাম জামাল মোল্লার ক্ষেত্রেও। তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ফারুক সরদার হত্যা মামলার প্রধান আসামি। চার বছর আগে ফারুককে দিনের আলোয় ইট ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই মামলায় জামিনে রয়েছেন জামাল। তাঁর ভাই কালাম মোল্লা ছিলেন কথিত সর্বহারা নেতা। যিনি উলানিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান লালু হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি।

এই ইউপিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে লড়াই করবেন নুরুল ইসলাম মিঠু। যিনি উলানিয়া উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তৃণমূল আওয়ামী লীগ দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিল। এই তালিকায় জামালের নাম ছিল না। তাই তৃণমূল আওয়ামী লীগ মিঠুর পক্ষে কাজ করছে।

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম ভুলু বলেন, ২০১৫ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে পাঁচজন বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন। সদ্য অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। এর প্রধান কারণ তৃণমূল আওয়ামী লীগ যাঁদের প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব দিচ্ছে, তাঁরা মনোনয়ন পাচ্ছেন না। জেলা আওয়ামী লীগ অন্য কারো নাম প্রস্তাব করে মনোনয়ন পাইয়ে দিচ্ছে।

উলানিয়া উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ওয়াদুদ বলেন, ‘আমিসহ তিনজনের নাম প্রস্তাব করে উপজেলা আওয়ামী লীগের কাছে আমরা বর্ধিত সভা করে পাঠিয়ে ছিলাম। অন্য দুজন হলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম মিঠু ও ইয়াসিন রাজু। তবে জামাল কিভাবে নৌকা পেলেন, তা আমরা জানি না।’

উলানিয়া দক্ষিণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান লিটন বলেন, ‘ইউনিয়ন থেকে তিনজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর মধ্যে আমিসহ বাকি দুজন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন হাওলাদার ও ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি নাছির উদ্দিন। আব্দুল হালিম মিলন চৌধুরীর নাম কোথাও ছিলেন না। কিন্তু তিনি মনোনয়ন পেলেন। আর এতে আমরা হতবাক।’

উলানিয়া উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নুরুল ইসলাম জামাল মোল্লা বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ষড়যন্ত্রমূলক। এই মামলার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমাকে পরাজিত করতে এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।’

উলানিয়া দক্ষিণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আব্দুল হালিম মিলন চৌধুরী তাঁর বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরিবার বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত থাকার বিষয়ে তিনি দায়ী নন বলে জানান।

তবে বরিশাল জেলা বিএনপির সভাপতি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ বলেন, ‘আব্দুল হালিম চৌধুরী বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তৎকালীন অর্থ প্রতিমন্ত্রী শাহ মোহাম্মদ আবুল হোসেনের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। ওই সময় হালিম এলাকায় ত্রাস করেছিলেন। তিনি এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।’

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেহেন্দীগঞ্জ পৌর মেয়র কামাল উদ্দিন খান বলেন, ‘ওই দুজন কিভাবে মনোনয়ন পেয়েছেন, সে বিষয়টি কেন্দ্র ও জেলা আওয়ামী লীগই জানে।’

বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুসকে একজন বিএনপি এবং আরেকজন হত্যা মামলায় সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জানতেন না বলে জানান।

বরিশাল ৪ আসনের সংসদ সদস্য পংকজ নাথ বলেন, ‘প্রতিবার তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে জেলা আওয়ামী লীগ ইচ্ছামতো প্রার্থী চূড়ান্ত করে কেন্দ্রে পাঠায়। আর এ জন্য নৌকা প্রতীকের প্রার্থী পরাজিত হন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা