kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

বিষাক্ত ঘাসে মরছে গরু

মহাদেবপুরে অবৈধ সিসা কারখানা

বদলগাছী-মহাদেবপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি   

২৩ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিষাক্ত ঘাসে মরছে গরু

মাঠে চাষ করার মতো জমি নেই। দুই ছেলে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালায়। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার শাহজাদপুর গ্রামের মোবারক হোসেনের। বয়সের ভারে কাজ করতে পারেন না। এক বছর ধরে একটু একটু করে জমানো টাকায় কিনেছেন গরু-ছাগল। স্বপ্ন ছিল এগুলো কয়েক মাসে মোটাতাজা করে বাজারে বেচবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন মরে গেছে।

অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা উৎপাদনের কাজ চলছিল পাশের একটি কারখানায়। এর বিষাক্ত কালো ধোঁয়া মেশানো মাঠের ঘাস খেয়ে গরু-ছাগল মারা গেছে।

সরেজমিন দেখা যায়, শাহজাদপুরে অবস্থিত মেসার্স হাজেরা রাইচ মিলের চারপাশে টিন দিয়ে ঘেরা সিসা কারখানা। কোনো সাইনবোর্ড নেই। কাছে গেলে বোঝা যায়; ভেতরে পুরনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা গলানো হয়। কারখানার ধোঁয়ায় আশপাশের মানুষের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। বিশেষ করে আশপাশের জমির ঘাস খেয়ে এ পর্যন্ত চার কৃষকের ছয়টি গরু ও দুটি ছাগল মারা গেছে।

কৃষক মোবারক হোসেন জানান, ২০ দিন আগে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেছেন মোটাতাজা করার জন্য। গত ১২ নভেম্বর সকালে গরু ও ছাগল কারখানার পাশের জমিতে ঘাস খায়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর হঠাৎ গরুর মুখ দিয়ে ফেনা উঠতে থাকে। বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর গরুটি মারা যায়। এর কিছুক্ষণ পর ছাগলটিও বমি করতে করতে মারা যায়।

তিনি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। দুই ছেলে ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। খুব অভাবের সংসার। অনেক কষ্ট করে জমানো টাকা দিয়ে গরুটি কিনেছিলাম। আর ছাগল এক মাস আগে তিন হাজার টাকা দিয়ে কিনেছিলাম। কিছুদিন মোটাতাজা করে বাজারে বেচব। যাতে কিছু টাকা আয় হয়। কিন্তু আমার আয়ের সম্বল শেষ হয়ে গেল। সুস্থ-সবল গরু-ছাগল মাঠে ঘাস খাওয়ানোর পরেই মারা গেছে।’

মোবারক হোসেনের মেয়ের জামাই শামসুদ্দিন জানান, গত ১৬ নভেম্বর সকালে সিসা কারখানার পাশের জমিতে তাঁর তিনটি গরুকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যান। দুপুরে বাড়িতে নিয়ে আসার কিছুক্ষণ পর গরু তিনটির মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে থাকে। এর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তিনটি গরুই মারা যায়।

স্থানীয় মুক্তি চন্দ্রা বলেন, ‘গত সোমবার আমার গরু-ছাগল মারা যায় কারখানার ওখানে জমির ঘাস খেয়ে।’

সিসা কারখানার মালিক (বগুড়া সদরের বাসিন্দা) আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমরা তো মাত্র চলতি মাসের (নভেম্বর) শুরুর সাত দিন ব্যাটারি গলিয়ে সিসা বানিয়েছি। জাহেরা রাইচ মিলের মালিকের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে কাজ করছিলাম। পরে স্থানীয়দের নানা অভিযোগের কারণে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি।’ সিসা কারখানা চালানোর জন্য অনুমতি আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেকেই তো নিয়ম-নীতির বাইরে করছে।’

জাহেরা রাইচ মিলের মালিক হেমায়েত হোসেন ঝন্টু বলেন, ‘গবাদি পশু মারা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে এমন অভিযোগ স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার ব্যাটারি গলানো বন্ধ করে দিই।’

খাজুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বেলাল বলেন, ‘অবৈধভাবে ব্যাটারি গলিয়ে সিসা উৎপাদন হচ্ছে জানার পর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আরিফুল ইসলামকে পাঠিয়েছিলাম। কারখানার সবাই পালিয়ে গেছে।’

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. মহির উদ্দিন বলেন, ‘পর্যাপ্ত নিয়ম-কানুন না মেনে খোলা পরিবেশে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা উৎপাদনের কারণে সেটার ধোঁয়া পরিবেশে যায়—যা পরিবেশ, মানুষ ও পশু-পাখির জন্য মারাত্মক ক্ষতি করে। জমির ঘাস যদি গবাদি পশু খায়, তবে অবশ্যই গবাদি পশুর মারাত্মক ক্ষতি হবে। এমনকি প্রাণহানিও হতে পারে।’

মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান মিলন বলেন, ‘অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা