kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

বুদ্ধি আছে, বিদ্যা নাই

২২ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বুদ্ধি আছে, বিদ্যা নাই

চরাঞ্চলের শিশুরা কেমন আছে? কিভাবে বেড়ে উঠছে? শিশু সুরক্ষায় নেওয়া সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগের সুফল কতটা পাচ্ছে? উপকূলের চরগুলোতে খোঁজ নিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র পটুয়াখালী প্রতিনিধি এমরান হাসান সোহেল। এ নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক

 

মনির, মনু, ঝুমুর ও ময়না। ওরা পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার চর বোরহানের শিশু। এই চরে শিশুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। বেশির ভাগই বিদ্যালয়ে যায় না। কেউ গেলেও ছয় মাস। বছরজুড়ে পাঠগ্রহণ প্রায় অসম্ভব। এর ওপর চলতি বছর করোনায় ওরা পুরোপুরি বিদ্যালয় ও লেখাপড়া বিমুখ।

অভাবের কারণে সংসারে জোগান দিতে কাজ করে মনির (৮)। দক্ষিণ চর বোরহানের রফিক মাঝির ছেলে। বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় দুই বছর আগে। পাঁচ-ছয় দিন গিয়েছিল। কিন্তু বিদ্যালয়ে গেলে পরিবারের আয় কমে যায়—এ কারণে আর যাওয়া হয়নি। নিয়মিত নদীতে মাছ ধরতে যায়। তার কথা, ‘আমি নদীতে যাই। মাছ ধরি। বইন্যার মধ্যে নৌকা যাতে না ডোবে, আমি যাতে বাঁচতে পারি—সবই তো বুদ্ধি দিয়া করি। আমার বুদ্ধি মাছ ধরায় খাডাইতে পারি। ঘরে ভাত থাকলে আমি স্কুলে যাইতাম। বুদ্ধি খাডাইয়া ভালো লেহাপড়াও করতে পারতাম।’

মনিরের বাবা রফিক মাঝি বলেন, ‘চরের সব মাইনসেরই অভাব। এই লইগ্যা পোলাপান সখ কইরগা স্কুলে ঠিকই ভর্তি অয়, কিন্তু আর লেহাপড়া করে না। স্কুলে ভর্তির পর অভাবের লইগ্যা নানা পেশায় কাম করে। চরের সব পোলাপানরে যদি সরকার চাউল দেতে, তাহেলে স্কুলে যাইতে।’ প্রায় একই ধরনের বক্তব্য অভিভাবক মধু মৃধা, শাজাহান হাওলাদার ও আবুল হোসেন মাঝির। আরেক অভিভাবক নুরে আলম মাঝি বলেন, ‘আমাগো চরের রাস্তাঘাট খুব খারাপ। রাস্তাঘাট না থাকায় অনেক পোলাপান বাইস্যাকালে স্কুলে যায় না। আবার স্কুলও অনেক কোম, দূরে ইস্কুল থাকনে পোলাপান যাইতে চায় না।’

বিভিন্ন চর ঘুরে দেখা গেছে, শিশুদের কারো হাতে জেলে নৌকার বৈঠা, কারো হাতে খেয়া নৌকার বৈঠা, কেউ জাল হাতে, কেউবা কৃষকের লাঙল হাতে কিংবা রাখালের লাঠি হাতে কঠোর শ্রমের কাজে নিয়োজিত। এরা আয় রোজগার করে। সংসারের সহযোগী হিসেবে কাজ করে।

ওদেরই দুজন মুক্তা (৯) এবং মনি (৯)। কালাম মৃধার মেয়ে মুক্তা আর আব্দুল খাঁর মেয়ে মনি। বাউফলের চরমিয়াজানে ওদের বসতি। পরশি বলে ওরা দুজন খেলার সাথি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একসঙ্গে পার করে দুজন। পুতুল খেলার বয়স না কাটলেও ওদের খেলতে হচ্ছে জীবনখেলা। মা-বাবার সংসারে বয়স্কদের মতো ওদেরও সাধ্যমতো আয় করতে হয়। তাই ওরা খেলার সময় পায় না। কখনো ধানের ছড়া কুড়ায়, কখনো ডালের ছড়া, কখনো মাছ শিকার করে, কখনো আবার মহাজনের বাড়িতে কাজ করে। মৌসুম পরিবর্তনে ওদের পেশার পরিবর্তন হয়। মনি বলে, ‘ইস্কুলে ক্যামনে যামু? কাম না করলে ঘরে ভাত পাই না।’ মুক্তার মা রেহেনা পারভীন বলেন, ‘মাইয়ারে লেহাপড়া করাইয়া কী অইবে? দুই-তিন বচ্ছর পর ওর বিয়া অইবে। ভাত জোডে না আবার লেহাপড়া?’ মূলত দারিদ্র্যের কারণে সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে বেশির ভাগ অভিভাবকের অনীহা।

চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্পিড ট্রাস্টের প্রধান সমন্বয়কারী হেমায়েত উদ্দিন বলেন, ‘এদের জীবনমান বাড়াতে হলে আলাদা একটি চর উন্নয়ন নীতিমালা প্রয়োজন। অন্যথায় এদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও বাসস্থানের দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হবে না। এ ছাড়া বাল্যবিয়ে, তালাকের মতো ঘটনা হতাশাজনকভাবে বাড়বে।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাইয়াদুজ্জামান বলেন, ‘সম্প্রতি একটি প্রকল্প হয়েছে। চর কিংবা বিদ্যালয় নাই—এমন এলাকায় এক হাজার বিদ্যালয় হবে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে উপবৃত্তি দেওয়া হয়। কলাপাড়া, গলাচিপা, দশমিনা ও রাঙ্গাবালীর কয়েকটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর বিস্কুট দেওয়া হয়। এ ছাড়া সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য দুপুরের খাবার দেওয়ার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। আমি বিশ্বাস করি, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার্থীরা অবশ্যই স্কুলে উপস্থিত হবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা