kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

কম বয়সীরা ভাতা পান বয়স্করা বঞ্চিত

কালিয়ায় সমাজকর্মী ও ইউপি সদস্যদের যোগসাজশ
ভাতা তোলার পর কেড়ে নিয়েছেন সমাজকর্মী
সধবা হয়েও বিধবা কার্ড পাওয়ায় বিব্রত এক নারী

সাইফুল ইসলাম তুহিন, নড়াইল   

২৪ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কম বয়সীরা ভাতা পান বয়স্করা বঞ্চিত

সরকারি নিয়মে, পুরুষদের ৬৫ আর নারীদের ৬২ বছর হলে বয়স্ক ভাতা পাওয়ার কথা। এই নিয়ম ভেঙে নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় কমবয়সীদের টাকার বিনিময়ে বয়স্ক ভাতার কার্ড দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে সমাজকর্মী ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্যদের যোগসাজশ রয়েছে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুমেরু খোলা গ্রামের ত্রিনাথ দত্ত (৫৫), হাড়িয়ারঘোপ গ্রামের রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস (৫০), শৈলেন বিশ্বাস (৪৮), অসিত বিশ্বাস (৫৩) বয়স্ক ভাতার কার্ড পেয়েছেন। এ ছাড়া মহাজনবাজারের কাপড় ব্যবসায়ী নৃপেন সাহা (৪৫), হারাধন দাসসহ (৪৮) অন্তত ৫০ জন এমন ব্যক্তি বয়স্ক ভাতার কার্ড পেয়েছেন, যাঁদের বয়স কম। এ বিষয়ে ব্যবসায়ী নৃপেন সাহা বলেন, ‘সম্পর্ক ভালো, তাই কার্ড হয়েছে।’

আর টাকা না দেওয়ায় কার্ড হয়নি মহাজন গ্রামের আলী মাহমুদ (৮০), হেমায়েত বিশ্বাস (৮৭) ও বিশ্বনাথ হাজরার (৬৭)।

পুরুলিয়া গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী ওহাব মোল্লা জানান, দুই বছর ঘুরে ছয় হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে একটি প্রতিবন্ধী কার্ড পেয়েছেন। কিন্তু এক বছরের ভাতার ৯ হাজার টাকা ব্যাংক থেকে তোলার পর কেড়ে নিয়েছেন সমাজকর্মী হারুন। তিনি চাচুড়ি, পুরুলিয়া, বাবরা হাচলা আর মাউলী ইউনিয়নের ভাতার দায়িত্বে।

এ ছাড়া ওহাবের বাবা মোদাচ্ছের মোল্লা মারা যাওয়ার পর তাঁর বয়স্ক ভাতার কার্ডটি হারুন সাত হাজার টাকায় বেচেন ধনাঢ্য ইউসুফ মিনার কাছে। ২৫ বছর আগে বিধবা হওয়া ফতেমা ইউপি সদস্য ও হারুনকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে তিন বছর ধরে কার্ডের জন্য ঘুরছেন। সুফিয়া নামের আরেক বৃদ্ধা হারুনকে চার হাজার টাকা দিয়ে পেয়েছেন কার্ড।

এদিকে টাকা দিতে না পারায় লক্ষ্মী বেগমের (৮৫) হয়নি ভাতার কার্ড। হাড়িয়ারঘোপ গ্রামের জেলে অমর বিশ্বাস (৬৫) কার্ড পাননি।

এসব বিষয়ে সমাজকর্মী হারুন বলেন, ‘ওহাব পাগল মানুষ সে যা বলেছে, সব মিথ্যা। ইউনিয়ন পরিষদ তালিকা দেয়, আমরা ভাতার কার্ড দিই। এখানে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নাই।’

মাউলী ইউনিয়নের অবস্থা আরো করুণ। মহাজন গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল মোল্লা। গাছ থেকে নারিকেল পেড়ে জীবিকা নির্বাহ করে ১০৫ বছর বয়সে মারা গেলেও ভাতা পাননি তিনি। তাঁর স্ত্রী জন্মান্ধ বড়ু বিবি (৮৪) বলেন, ‘আমার নামে কি কার্ড হবে?’

বড়ু বিবির ছেলের বৌ ফরিদা বেগম জানান, শাশুড়ির ভাতা করতে ইউপি সদস্য সুজল আট হাজার টাকা চান।

বেদেপল্লীর বাসিন্দা মমতাজ বেগম বলেন, ‘সুজলকে ছয় হাজার টাকা দিয়ে আমার কার্ড হয়েছিল। কিন্তু দুই হাজার টাকা বেশি পেয়ে আরেকজনের কাছে কার্ডটি বিক্রি করে দিয়েছেন। নানা জায়গায় অভিযোগ দেওয়ায় সুজল আমাকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।’

এসব বিষয়ে মাউলী ইউপির ৭ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য সুজল ঠাকুর বলেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র। প্রতিপক্ষের লোকেরা আমাকে ফাঁদে ফেলতে চায়।’

মহাজনবাজার এলাকার প্রভূ বিশ্বাসের স্ত্রী গুরুদাসী ১২ হাজার টাকা দিয়ে পেয়েছেন বিধবা ভাতার কার্ড। সধবা হয়েও বিধবা কার্ড পাওয়ায় বিব্রত এই নারী। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর বয়স্ক ভাতার কার্ডের জন্য ১২ হাজার টাকা দিছিলাম। সেটা না করে খাজা মেম্বার আমার নামে কার্ড দিছে। এখন আমি মানুষের কাছে মুখ দেখাতে পারছি না।’

কালিয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং উপজেলা ভাতা বিতরণ কমিটির সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যেসব এলাকায় অভিযোগ পাচ্ছি, তা সমাধানের চেষ্টা করছি।’

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক রতন কুমার হালদার বলেন, ‘এ নিয়ে আমরা কিছুটা বিব্রত। যা বলার জেলা প্রশাসক বলবেন।’

নড়াইলের জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, ‘ভাতার অনিয়মের তদন্ত চলছে। এ ক্ষেত্রে দোষী চেয়ারম্যান, মেম্বার কিংবা সমাজকর্মী যেই হোক, তাকে শাস্তি পেতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা