kalerkantho

সোমবার । ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৩ নভেম্বর ২০২০। ৭ রবিউস সানি ১৪৪২

পঞ্চগড় প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্র

সেবাকেন্দ্রই ‘প্রতিবন্ধী’

পঞ্চগড় প্রতিনিধি   

২৩ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সেবাকেন্দ্রই ‘প্রতিবন্ধী’

বেশির ভাগ মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু গত দুই বছরেও মেশিনগুলো মেরামত করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। এ চিত্র পঞ্চগড় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের। অসহায়-দরিদ্র মানুষকে সেবাদানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, কেন্দ্রের প্রতিবন্ধীবিষয়ক কর্মকর্তা, স্পিস ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট ও অকুপেশনাল থেরাপিস্ট পদে জনবল নেই দীর্ঘদিন ধরে। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কনসালট্যান্ট (ফিজিওথেরাপি) ডা. মাহফুজুর রহমান। তাঁর বাসা ঢাকায় হওয়ায় নিয়মিত কেন্দ্রে আসেন না। মাসে দু-একবার এলেও থাকেন কেন্দ্রের কক্ষেই। সেখানে ঘুমানোর জন্য বিছানা-বালিশ আছে।

আর ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট দিপক কুমার রায়ের বাড়ি পাশের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তাঁকে কেন্দ্রে পাওয়া যায় না। এলেও দু-এক ঘণ্টা থেকে আবার বেরিয়ে যান। বাকি সময় কেন্দ্রটির কাছেই নিজের ‘দীপ ফিজিওথেরাপি সেন্টার’-এ বসেন তিনি। ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট হলেও নামের পাশে ডাক্তার শব্দটি জুড়ে দিয়েছেন তিনি। নিজেকে বাতব্যথা, প্যারালিসিস ও ফিজিওথেরাপির বিশেষজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ব্যানারে। কেন্দ্রে আসা বেশির ভাগ রোগীকে ভাগিয়ে নিজের সেন্টারে নিয়ে যান তিনি। একই কাজ করেন ফিজিওথেরাপি সহকারী আব্দুল জব্বার ও জান্নাতুল ফেরদৌস দম্পতি। কেন্দ্রের পাশেই নিজেদের বাড়িতে ফিজিওথেরাপি সেন্টার গড়ে তুলেছেন তাঁরা। এ ছাড়া দুপুরের পর দু-একজন ছাড়া কেন্দ্রে কাউকে দেখা যায় না। ফিজিওথেরাপির জন্য ব্যবহৃত আইএসটি ও ইএফটি মেশিন দুটি শুধু চালু আছে। এ ছাড়া এসডাব্লিউডি, ট্রাকশন, আইআরআর, ওয়াক্স বাথ, ফুট স্টুপারসহ অন্য সব মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে প্রায় দুই বছর ধরে। কেন্দ্রের একাধিক ব্যক্তির নিজস্ব থেরাপি সেন্টার থাকায় তাঁরা মেশিনগুলো ঠিক করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেননি। তাই প্রতিদিন অনেক রোগী সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। আর যাদের সামর্থ আছে তারা কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত সেন্টারে থেরাপি নিচ্ছে।

সদর উপজেলার তেলিপাড়া এলাকার জাহানারা বেগম অভিযোগ করেন, ‘আমার প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে আমি কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো সেবা পাইনি। এত বড় কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও সেবা না পাওয়া দুঃখজনক। সেখানে যদি সব ধরনের মেশিন থাকে এবং সবাই আন্তরিকভাবে সেবা দেয় তাহলে আমাদের মতো দরিদ্র মানুষের খুব উপকার হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পঞ্চগড় সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য কেন্দ্রটিতে অসহায়-দরিদ্র প্রতিবন্ধীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোনো নিয়ম-কানুন নেই সেখানে। যে যার মতো অফিস করছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন থেকে পরিচালিত হওয়ায় আমাদের কোনো কথাও তারা শোনে না। এখন যা অবস্থা তাতে অফিস থাকা, না থাকা সমান।’ অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট দিপক বলেন, ‘এই কেন্দ্রে যারা আসে তাদের বেশির ভাগ দরিদ্র মানুষ। তারা টাকা দিয়ে সেবা নেওয়ার মতো না। তাই তাদের আমার ব্যক্তিগত ফিজিওথেরাপি সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মেশিনগুলো দুই বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। আমরা একাধিকবার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি।’

পঞ্চগড় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধীবিষয়ক কর্মকর্তা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘করোনাকালে ঢাকা থেকে নিয়মিত আসতে পারিনি। এখন নিয়মিত অফিস করছি। অন্য কোনো জায়গা না থাকায় ঢাকা থেকে এসে অফিসেই থাকি।’

অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক রোগীই এ বিষয়ে আমার কাছে অভিযোগ করেছে। আমি মৌখিকভাবে তাদের (অভিযুক্তদের) সতর্ক করেছি। এ ছাড়া আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়েছি। আবারও এমনটা হলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্তব্য