kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

খাগড়াছড়ির ‘রাজা’

তিন যুগ ধরে মাহবুবের মুঠোয় পরিবহন খাত

আবু দাউদ, খাগড়াছড়ি   

২১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খাগড়াছড়ির ‘রাজা’

মাহবুব উল আলম

খাগড়াছড়ির পরিবহন খাতে মাহবুব উল আলম অলিখিতভাবে তিন যুগের ‘রাজত্ব’ চালাচ্ছেন। তিনটি পদে তাঁর মাসিক বৈধ সম্মানী ৪৮ হাজার টাকা। তাঁর ছোট ভাইদের ভয়ে কেউ টুঁ শব্দটি করতে সাহস পায় না।

তাঁর ছোট ভাই জাহেদুল আলম জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। আরেক ছোট ভাই খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র রফিকুল আলম। সবার ছোট দিদারুল আলম জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তাঁদের আরেক ভাই মুজিবুল আলম খাগড়াছড়ি হালকা মোটরযান (মাইক্রো) মালিক সমিতির সভাপতি।

মাহবুবকে পরিবহন খাতের শীর্ষ নেতা এই জন্য বলা হয় যে তিনি এক দশক ধরে খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি। ১৯৮৫ সাল থেকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। এক যুগ ধরে জিপ মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ। এর পেছনে কারণও আছে। এই তিন পদে সম্মানী বেশি। সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি হিসেবে সম্মানী পান ১৬ হাজার টাকা, বাস-মিনিবাস সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পান ২০ হাজার টাকা আর জিপ সমিতির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নেন ১২ হাজার টাকা।

মালিক গ্রুপের সদস্য রোকন উদ্দিন অভিযোগ করেন, নিজের গাড়ি না থাকা সত্ত্বেও ২০০৯ সালে প্রভাব খাটিয়ে মালিক গ্রুপের সভাপতি হন মাহবুব। এর পর থেকে বাণিজ্য সংগঠন আইন অমান্য করে নির্বাচন ছাড়াই গায়ের জোরে সংগঠনের সভাপতি হন। খলিলুর রহমান খোকনকে করা হয় মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক। খলিলের বড় বোনের স্বামী এই মাহবুব। এ ছাড়া বৈধ নির্বাচন না হওয়ায় মালিক গ্রুপের কোনো জবাবদিহি নেই। লাইন খরচের নামে প্রতি মাসে আয় হওয়া প্রায় ১৭ লাখ টাকার কোনো হদিস নেই বলে অভিযোগ করেন অন্য সদস্যরা।

খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের ১৪৪ সদস্যের বেশির ভাগ কমিটির ওপর অনাস্থা দিলেও তা কাজে আসেনি। সর্বশেষ একতরফা নির্বাচনের প্রতিবাদকারী গ্রুপের সদস্য আব্দুল লতিফ হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত তিন সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বললেও কেউ জবাব দেননি। এদিকে প্রতিবাদ করায় আব্দুল লতিফের দুটি গাড়ি সমিতির রোটেশন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে এক বছর ধরে দুটি বাস চলাচল করতে পারছে না।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৯০ সালে ‘খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি’ গঠন করা হয়। ২০০৪ সালে ‘খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ’ নামে যাত্রা করে, যা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনভুক্ত। এত দিন নির্বাচন না হলেও হাত তুলে বা কণ্ঠভোটে সভাপতি/সম্পাদক নির্বাচন করা হতো। ২০০৯ সালে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাহবুব সভাপতি হওয়ার পর থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

মালিক গ্রুপের সদস্য বিশ্বজিৎ রায় দাশ অভিযোগ করেন, বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা ১৪(১) ধারা অনুযায়ী, পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে তিন সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচনী বোর্ড ও তিন সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচনী আপিল বোর্ড গঠন করতে হয়। তা অগ্রাহ্য করে সর্বশেষ ২০১৯ সালের ২ নভেম্বর কমিটি গঠিত হয়েছিল। তফসিল ঘোষণা ছাড়াই সেখানে আলম পরিবারের চার সদস্য মিলে জোর করে কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে মেয়র রফিকুল অন্যায়ভাবে বড় ভাইকে সভাপতি ও খলিলুরকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করেন। এ নিয়ে সংগঠনের ১৪৪ সদস্যের মধ্যে ৯০ জন আপত্তি জানান। তাঁরা একতরফা কমিটি বাতিল করে নির্বাচন দেওয়ার দাবি তোলেন।

এ বিষয়ে মালিক গ্রুপের সভাপতি মাহবুব উল আলম বলেন, ‘আমরা বেআইনি কিছুই করিনি। গঠনতান্ত্রিক নিয়মে কণ্ঠভোটে নির্বাচন হয়েছে। শ্রমিক নেতা হয়েও মালিক নেতা হওয়া যাবে না, এমন কিছু বিধানে নেই।’

এ ব্যাপারে পরিচালক (বাণিজ্য সংগঠন) ড. জাহাঙ্গির আলম বলেন, ‘মালিক গ্রুপের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টিও-ওয়ান খন্দকার নুরুল হক ভুইয়াকে বারবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা