kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সাইবার অপরাধীদের প্রধান টার্গেট নারী

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাইবার অপরাধীদের প্রধান টার্গেট নারী

ঘটনা-১ : রাজশাহী নগরীর এক মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে। তাঁর সঙ্গে মোবাইল ফোনের ইমোতে পরিচয় হয় এক ব্যক্তির। তিনি নিজেকে আমেরিকানপ্রবাসী পরিচয় দেন। একপর্যায়ে তাঁর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। প্রতিশ্রুতি দেন বিয়ের পরে তাঁকে আমেরিকা নিয়ে যাবেন তিনি। তাঁর জন্য ভিসা-পাসপোর্ট করতে টাকার দরকার হবে। ওই ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস করে একে একে তাঁর হাতে ১১ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়। মাঝে পরিচয় গোপন করে ওই ব্যক্তি তাঁকে বিয়েও করেন। শেষে মেয়েটি বুঝতে পারেন তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে টাকাও হাতিয়ে নিয়েছেন তাঁর বাবার কাছ থেকে। কিন্তু তখনো তাঁর আসল পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেননি ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের লোকজন। শেষে গত ১৯ সেপ্টেম্বর নগরীর পবা থানায় বাদী হয়ে প্রতারণার মামলা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট তদন্তে নেমে ওই প্রতারকের আসল পরিচয় নিশ্চিত করে। ততক্ষণে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। তবে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। এই প্রতারক হলো মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের বজরুসার গ্রামের আলী আজগর খানের ছেলে সাইফুল খান।

ঘটনা-২ : মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের দেওয়া তথ্য মতে, রাজশাহীর কলেজের এক ছাত্রীর সঙ্গে ফেসবুক মেসেঞ্জারে সানজিদা ইসলাম নামের এক মেয়ের পরিচয় হয়। এরপর তাঁদের মধ্যে মোবাইল নম্বর আদান-প্রদানও হয়। পরবর্তী সময়ে ওই আইডি থেকে অজ্ঞাতপরিচয় একটি ছেলে মেয়েটির কাছে তাঁর দুই বান্ধবীর মোবাইল নম্বর চান। কিন্তু তিনি রাজি না হওয়ায় তাঁর ফেসবুকের ছবির সঙ্গে অশ্লীল ছবি জুড়ে দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা করা হয়। শেষে এ ঘটনায় নগরীর কাটাখালী থানায় একটি জিডির সূত্র ধরে সাইবার ক্রাইম ইউনিট ওই প্রতারককে চিহ্নিত করে।

ঘটনা-৩ : জাল কাগজে বিয়ে করে দিনের পর দিন ধর্ষণ, পরে সেই সব আপত্তিকর ছবি মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে রাজশাহীর বরেন্দ্র কলেজের এক ছাত্রীর সঙ্গে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। শেষ পর্যন্ত ওই ভুক্তভোগী নগর পুলিশের দ্বারস্থ হলে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সদস্যরা অন্তরঙ্গ ছবিগুলো উদ্ধারসহ ওই প্রতারককে গ্রেপ্তার করেন। জানা যায়, একাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া ওই ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন নগরীর শালবাগান এলাকার সানি আহমেদ নামের ওই যুবক। কিছুদিন পরে মেয়েটিকে বিয়েও করেন। এরপর বউকে নিয়ে কখনো কক্সবাজার, কখনো রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে গিয়ে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সেই সময় বেশ কিছু অন্তরঙ্গ ছবিও তোলেন দুজনে। একপর্যায়ে মেয়েটি জানতে পারেন ছেলেটির আগের স্ত্রী রয়েছে। কিন্তু সেই তথ্য গোপন করে কলেজছাত্রীকে বিয়ে করেন সানি। তাঁদের বিয়ের কাগজপত্রও আসল নয়। পরে ওই ছাত্রী যখন সানির কাছ থেকে সরে আসতে চান, তখন তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্তরঙ্গ মুহৃর্তের ছবিগুলো তাঁর মেসেঞ্জারে দেওয়া হয়। যৌন সম্পর্ক না রাখলে সেই ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিসহ নানাভাবে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা করা হয়। শেষে নগরীর বোয়ালিয়া থানায় মামলা করা হলে সাইবার ক্রাইম ইউনিট সানির কাছ থেকে সেই ছবিগুলো উদ্ধার করে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় প্রতারক সানিকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহীতে ব্যাপক হারে বেড়েছে এই ধরনের সাইবার অপরাধের ঘটনা, যার প্রধান টার্গেট নারীরা। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়া, ব্ল্যাকমেইল, ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, নির্যাতন, মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতারণা করে বিয়ে করাসহ নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ বেড়েছে। তবে এই অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটছে নারীদের প্রতারিত হওয়ার ঘটনা—এমনটিই নিশ্চিত করেছে পুলিশ। গত কয়েক দিনে মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট অন্তত ৫০টি অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে এই ধরনের তথ্য পেয়েছে। তবে মহানগর পুলিশ সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও নিশ্চিত করেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নারীর সঙ্গে প্রতারণার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে স্বীকার করেন রাজশাহী মহানগর পুলিশের সাইবার ইউনিটের প্রধান উৎপল কুমার চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে এমন অনেক ঘটনা ঘটছে, যা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু গত ১৭ সেপ্টেম্বর মহানগর পুলিশ কমিশনার স্যারের নির্দেশে সাইবার ক্রাইম ইউনিট গঠনের পর এই ধরনের অপরাধ নিয়ে জোর তৎপরতা শুরু করেছে পুলিশ। আগে মামলা হলেও আসামি চিহ্নিত করা যেত না। এখন আমরা দ্রুত আসামি চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারছি। ফলে এই ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এখন জোর ভূমিকা রাখছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা