kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

১০ কোটি টাকার ‘খেলা’

কুদ্দুস বিশ্বাস, কুড়িগ্রাম (আঞ্চলিক)   

১৩ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১০ কোটি টাকার ‘খেলা’

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। (ডানে) তীরে বালুর স্তূপ। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র ও সোনাভরি নদীর তীর ঘেঁষে দিনরাত ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। এভাবে বালু তোলায় ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীরজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। আর ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রায় ১০ কোটি টাকার প্রকল্প চলছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর ঘুরে দেখা গেছে, দুই উপজেলায় প্রায় অর্ধশত ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু তুলছে কারবারিরা। রৌমারীর ঘুঘুমারী থেকে বলদমারা হয়ে ফুলুয়ারচর পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এবং রাজীবপুরের মদনেরচর থেকে নয়াচর পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে প্রায় ৩০টি ড্রেজারে বালু তোলা হচ্ছে।

সরকারি নিয়ম অনুসারে, যে স্থানে পাউবোর প্রকল্পের কাজ হবে, সেখান থেকে কমপক্ষে দুই হাজার মিটারের মধ্যে কোনোক্রমে বালু উত্তোলন করা যাবে না। অথচ প্রকল্পের ৫০ থেকে ১০০ মিটারের মধ্যে অবাধে বালু তোলা হচ্ছে। একই দৃশ্য দেখা গেছে রাজীবপুরের চরনেওয়াজী এলাকায়ও। বালু তুলে ব্যবসা করছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন। এখানে চারটি পক্ষের ছয়টি ড্রেজার বসানো হয়েছে।

কুড়িগ্রাম পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন রোধে রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলাকে রক্ষা করতে প্রায় ৪৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে রৌমারীর ঘুঘুমারী থেকে ফুলুয়ারচর ঘাট পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার এবং রাজীবপুর সদরের মেম্বারপাড়া থেকে মোহনগঞ্জ বাজার পর্যন্ত তিন হাজার ৮০০ মিটারজুড়ে নদের তীরে সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হবে। চলতি বছরে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি গ্রুপের কাজ চলছে।

এদিকে পাউবোর ভাঙন রোধে সিসি ব্লক ডাম্পিং ও জিও ব্যাগ ফেলার কাজে দুর্নীতি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে স্থানীয় লোকজন। স্থানীয় বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন, আব্দুর রফিক ও রুবেল মিয়া অভিযোগ করেন, জিও ব্যাগে বালু ভরার নিয়ম থাকলেও ভরা হচ্ছে কাদামাটি। দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার বিপ্লব চন্দ্র ব্যানার্জি পাউবোর প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করেই তা করছে।

মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আলম মিয়া বলেন, ‘পাউবোর দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার প্রকাশ্যে দুর্নীতি করছেন; কিন্তু প্রকৌশলীরা চুপ করে রয়েছেন। এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানানোর পর তিনি উল্টো হুমকি দেন। বলেন, বারবার ফোন করলে প্রকল্প বাতিল করে দেওয়া হবে।’

রাজীবপুরের চরনেওয়াজী গ্রামের বাসিন্দা সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘নদের যে স্থানে ভাঙন প্রতিরোধে বালুর বস্তা ফেলা হবে, সেই স্থান থেকেই ড্রেজার দিয়ে বালু ওঠানো হচ্ছে। আমরা বালু তোলা বন্ধের দাবি জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছি। ইউএনও একদিন এসে বালু তোলা বন্ধ করে গেছেন। কিন্তু এক দিন পর সেই স্থানে আবার বালু তোলা শুরু হয়।’

রৌমারীর ফুলুয়ারচর গ্রামের হাফেজ আলী, কুটিরচর গ্রামের আলমাছ হোসেন ও বলদমারা গ্রামের আব্দুর রশিদ অভিযোগ করেন, বালু তোলা বন্ধ করা না গেলে কোনো প্রকল্পই কাজে আসবে না।

বন্দবেড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবীর হোসেন বলেন, ‘বালু কারবারিরা খুবই শক্তিশালী। কোনোক্রমে তাদের দমন করা যাচ্ছে না। প্রশাসনও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

রাজীবপুরের ইউএনও নবীউল ইসলাম বলেন, ‘বালু ব্যবসায়ীদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নদের তীর থেকে বালু তোলা যাবে না। তারা যদি বন্ধ না করে, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রৌমারী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) গোলাম ফেরদৌস জানান, সরেজমিন পরিদর্শন করে অবৈধ বালু কারবারিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল হক বলেন, ‘প্রকল্পস্থলে কখনো বালু উত্তোলন করা যাবে না। আমাদের উপসহকারী প্রকৌশলীদের এ বিষয়ে কড়া নির্দেশনা দেওয়া আছে।’ অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখনো কেউ আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে আসেনি। তার পরও খোঁজ নিয়ে দেখব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা