kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ভালো নেই বানীশান্তার মেয়েরা

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড় জলোচ্ছ্বাস, অব্যাহত নদীভাঙন, চিকিৎসা সুবিধার অপ্রতুলতা, তার ওপর করোনার প্রভাব খুলনার বানীশান্তায়

কৌশিক দে, খুলনা   

২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ভালো নেই বানীশান্তার মেয়েরা

এক পাশে সুন্দরবন, আরেক পাশে মোংলা বন্দর, প্রমত্ত পশুর নদের তীরে খুলনার দাকোপ উপজেলার বানীশান্তা পল্লী। নদের ভাঙনে দিন দিন বিলীন হচ্ছে পল্লীর ভিটা। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, অব্যাহত নদীভাঙন, চিকিৎসা সুবিধার অপ্রতুলতা, তার ওপর করোনার প্রভাবে ভালো নেই খুলনার বানীশান্তা যৌনপল্লীর বাসিন্দারা। মোংলা ও দাকোপ উপজেলার বুকচিরে বয়ে যাওয়া পশুর নদের গ্রাসে প্রায়ই কাবু হয় এখানকার বাসিন্দারা।

ভুক্তভোগীরা জানায়, বানীশান্তা পল্লীর প্রধান সমস্যা নদীভাঙন। প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে পল্লীর ঘর। এ অবস্থা চলতে থাকলে একদিন পুরো পল্লীই বিলীন হয়ে যাবে। এর মধ্যে গত মার্চ থেকে করোনা আতঙ্কের কারণে পল্লীর বাসিন্দারা অনেকটা কর্মহীন হয়ে পড়েছে।

সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৫৪ সালে মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে শহরতলির কুমারখালী এলাকায় একটি যৌনপল্লী স্থাপন করা হয়। পরে সেটি দাকোপ উপজেলার বানীশান্তা এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে যৌনপল্লীটিতে শিশু-নারী-পুরুষ মিলিয়ে আড়াই শ মানুষের বাস। যাদের মধ্যে যৌনকর্মীর সংখ্যা ৯২ জন। এখানে বাড়ির সংখ্যা ৩৭টি। কিন্তু ফি বছর নদীভাঙন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস পল্লীর বাসিন্দাদের নাজেহাল করে ছাড়ছে। পানি সরবরাহব্যবস্থা চালু হওয়ায় সুপেয় পানির সংকট কিছুটা কাটলেও নদীভাঙন তাদের সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে। যৌনকর্মীদের সন্তানদের জন্য বেসরকারি সংস্থার পরিচালিত শিশু সুরক্ষা বিদ্যালয় থাকলেও দুই-তিন বছর আগে তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শিশুদের অনেকে স্থানীয় স্কুলগুলোতে পড়ছে। কোনো কোনো স্কুল শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থাও রেখেছে।

পল্লীর সভানেত্রী রাজিয়া বেগম (৪৮) বলেন, ‘নদীভাঙন আমাদের সব শেষ করে দিচ্ছে। তারপর করোনা আতঙ্ক। অনেকে ঘর ভাড়া দিতে পারছে না। দুবেলা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই ভাঙন থেকে রক্ষা পেলে এখানকারা বাসিন্দা বাঁচত।’

রাজিয়া বেগম আরো বলেন, ‘দুর্গম এলাকা বলে এখানে ভালো চিকিৎসাও জোটে না। কেউ হঠাৎ অসুস্থ হলে তাকে বাইরে নেওয়া দুষ্কর। কেউ কেউ যৌন, চর্ম রোগে ভোগে। ডাক্তার দেখাতে পারে না। আমরা মানুষের অধিকার নিয়ে বাঁচতে চাই। এ জন্য সরকারসহ সরার সহযোগিতা চাই।’

পিংকী মুন্সি (২২) বলেন, ‘আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। দুই হাজার টাকা ঘর ভাড়া। বিদ্যুৎ এসেছে, তাই ভাড়া বাড়বে। নিজে বাঁচব নাকি পরিবারকে টাকা পাঠাব—এ নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়। আমাদের তো কেউ ভালো চোখে দেখে না, কিন্তু আমরাও তো মানুষ। এখন সব থেকে বিপদে নদীর ভাঙন নিয়ে। ভাঙন থেকে বাঁচলে আমাদের জীবন বাঁচত।’

সম্প্রতি এখানে চিকিৎসা দিতে আসা বিদ্যানন্দ ভাসমান হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আসমা আক্তার বলেন, ‘আমাদের দেশে যৌনকর্মীদের ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়, এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। পরিবেশগত কারণে এখানকার নারীরা যৌন ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আমাদের এক দিনের সেবায় তাঁরা অনেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। আবার স্যানিটেশন অবস্থাও ভালো নয়।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘বানীশান্তার নদীভাঙন সমস্যা দীর্ঘদিনের। নদীভাঙন থেকে এই এলাকার মানুষকে রক্ষার জন্য একাধিকবার লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন মহলে জানিয়েছি। আমরা স্থানীয়ভাবেও কাজ করছি। কিন্তু কোনোভাবে ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না।’

আব্দুল ওয়াদুদ জানান, বানীশান্তার যৌনকর্মীদের জন্য তিন তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ, তাঁদের ছেলে-মেয়েদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করার বিষয়গুলো প্রক্রিয়াধীন। এসব ঊদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা পাল্টে যাবে।

মন্তব্য