kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

পানির জন্য চার মাইল হাঁটা

মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



পানির জন্য চার মাইল হাঁটা

‘পুকুরের নোনা পানি খাওয়ার পর গলা আটকায়ে আসে। প্রতি কলস পানি ১০ টাকা দরে কিনে খাবার মতো ক্ষ্যামতাও আমাগেরে নেই। তাই প্রায় দুই মাইল পথ মাড়ায়ে পানি নিতে আইছি।’ কথাগুলো বলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দেওল গ্রামের গৃহবধূ হাফিজা বেগম। তিনি প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে শংকরকাঠি গ্রামে টিউবওয়েলের পানি সংগ্রহ করতে এসেছেন। প্রতিদিন দুইয়ে দুইয়ে চার মাইল হেঁটেই তাঁকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হয়।

খুটিকাটা গ্রামের রোজিনা খাতুন জানান, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চার গ্রামের মানুষ লাইন দিয়ে পানি সংগ্রহ করে। চার গ্রামের মধ্যে খাওয়ার উপযোগী পানির একটিমাত্র টিউবওয়েল হওয়ায় অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কলস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাই পানি আনতে গিয়ে গৃহস্থালির অন্য কাজ করার সুযোগ থাকে না। তিনি বলেন, ‘বড়লোকেরা পানি কিনে খাচ্ছে। আর আমাগের মতো গরিব মানুষগের ভরসা এই টিউবওয়েল।’

পানি সংগ্রহে আসা নারী, শিশুসহ স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই থেকে চার কিলোমিটার পর্যন্ত দূরবর্তী কাছিহারানী, দেওল, কাঠালবাড়িয়া ও খুটিকাটা গ্রাম থেকে এসেছে তারা। নিজেদের গ্রামে পুকুরের পানি ঘোলা ও লবণাক্ত হওয়ায় তা পানের অযোগ্য। আর্সেনিক ও আয়রন থাকার পাশাপাশি টিউবওয়েলর পানিও লবণাক্ত। এ কারণে জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে দূরবর্তী শংকরকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন ‘বদনের ভাগাড়’ এলাকার টিউবওয়েলে পানি নিতে আসে।

সরেজমিনে কাছিহারানী, কাঠালবাড়িয়া, দেওল ও খুটিকাটা গ্রাম ঘুরে জানা যায়, আইলার পর থেকে মূলত এসব এলাকায় খাওয়ার পানির সংকট দেখা দেয়। সরকারি অর্থে খনন করা পুকুর থেকে মানুষ খাওয়ার পানি সংগ্রহ করে আসছিল। আম্ফানে পুকুরগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পানির কষ্ট তীব্র আকার ধারণ করে। আম্ফানের পর পানির কষ্ট দূর করতে বেসরকারি উদ্যোগে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা হলেও নানা কারণে তা বন্ধ হয়ে গেছে। আর উপকূলীয় এলাকায় যোগাযোগের মাধ্যম ভালো না হওয়ায় খাওয়ার পানি নিয়ে রীতিমতো হাহাকার চলছে।

এলাকাবাসী জানায়, সমবায় ভিত্তিতে উপজেলার দেওল ও শংকরকাঠি গ্রামে গড়ে তোলা দুটি শোধনাগার থেকে খাওয়ার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হলেও নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়। ফলে খেটে খাওয়া আর দিনমজুর শ্রেণির পাশাপাশি সাধারণ পরিবারের পক্ষে প্রতিদিন খাওয়ার পানি কিনে খাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নিতান্ত বাধ্য হয়ে তাই খাওয়ার উপযোগী একটু পানির জন্য আরো অনেকের মতো এসব গ্রামের শত শত মানুষ প্রতিদিন ভিড় জমায় শংকরকাঠি গ্রামে।

শংকরকাঠি গ্রামের বদনের ভাগাড় এলাকার টিউবওয়েল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত রবিউল ইসলাম ও শারমীন আক্তার বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষ শংকরকাঠি থেকে পানি সংগ্রহ করে।’

কাশিমাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ জানান, এলাকায় একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে চার গ্রামের মানুষের পানি সমস্যা দূর করার চিন্তা-ভাবনা চলছে। উপজেলা সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এরই মধ্যে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে কিছু প্লাস্টিকের ট্যাংক বিতরণ করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা