kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দাঁড়ানোর আগেই ছোবল

শান্ত মৌসুমেও অশান্ত তিস্তা ♦ গঙ্গাচড়ায় ভাঙনে নিঃস্ব শতাধিক পরিবার
♦ বানভাসি মানুষের পাশে নেই কেউ

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দাঁড়ানোর আগেই ছোবল

তিস্তার ভাঙনের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে লোকজন। ছবিটি গত শুক্রবার রংপুরের গঙ্গাচড়ার পূর্ব ইচলী এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে রংপুরের তিস্তাপারে ফের বন্যা দেখা দেয়। এতে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ডুবে যায় রোপা আমনসহ ফসলের ক্ষেত। গত শুক্রবার বিকেল থেকে তিস্তার পানি কিছুটা কমলেও নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের শংকরদহ ও পশ্চিম ইচলীর পর এবার তিস্তার ভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছে পূর্ব ইচলী গ্রাম। গত কয়েক দিনে এ এলাকার শতাধিক ঘরবাড়িসহ ঈদগাহ মাঠ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন আতঙ্কে উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে হাজারো পরিবারের।

ক্ষতিগ্রস্তরা বলছে, গত কয়েক দফার দীর্ঘস্থায়ী বন্যা শেষে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল তারা। বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি মেরামতসহ ক্ষতিগ্রস্ত আমনের ক্ষেতে নতুন করে চারাও লাগিয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণসহ উজানের পানিতে তিস্তার নিম্নাঞ্চল ফের প্লাবিত হয়। সেই সঙ্গে দেখা দেয় তীব্র নদীভাঙন। বর্তমানে তিস্তা-তীরবর্তী লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পূর্ব ইচলী ও পশ্চিম ইচলী গ্রামে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় লোকজন ভাঙন আতঙ্কে তাদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

সরেজমিনে গতকাল দুপুরে পূর্ব ইচলী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে পানি থইথই করছে। দুই দিন ধরে পানিবন্দি থাকা পরিবারগুলো দুর্ভোগে পড়েছে। পানির তোড়ে রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় চরাঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় ওই গ্রামের একের পর এক ঘরবাড়ি নদীতে ভেঙে পড়ছে। কেউ কেউ আগাম ঘরবাড়ি ভেঙে নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

গতকাল আজিজুল ইসলাম, আশরাফ আলী, মোবারক আলী, হযরত আলী, মিটু মিয়া, মনোয়ারুল ইসলাম, আকতারুল ইসলাম, সাজু মিয়া, আরিফুল হক, মমিনুর, নুর ইসলাম, সমসের আলী, তালেব আলী, আব্দুস সামাদসহ প্রায় ৫০ পরিবারের ঘরবাড়ি তিস্তায় ভেঙে গেছে।

এলাকার লোকজন বলে, ভাদ্র-আশ্বিন মাসে সাধারণত তিস্তা শান্ত থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফসলি জমি, পুকুরসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভেসে গেছে। এখন ইচলী ঈদগাহ মাঠের অস্তিত্বই আর নেই। ভেঙে গেছে পূর্ব ইচলী গ্রামের হরি মন্দিরটিও। নদীগর্ভে বিলীন হওয়া ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন এতিমখানা ও হাফিজিয়া মাদরাসাটিও যেকোনো মুহূর্তে তিস্তার পানিতে মিশে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে তারা।

স্থানীয়রা জানায়, তিস্তার মূল প্রবাহ শেখ হাসিনা গঙ্গাচড়া সেতুর নিচ দিয়ে প্রবাহিত না হয়ে দুটি নতুন চ্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছে। শংকরদহ এলাকায় একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ভিন্ন চ্যানেল বের হয়ে চর ইচলী হয়ে এসকেএস বাজার দিয়ে একটি, গঙ্গাচড়ার শেষ প্রান্ত সেরাজুল মার্কেটের কাছে সেতুর নিচ দিয়ে অন্য চ্যানেলটি প্রবাহিত হচ্ছে। নতুন এই গতিপথ দুটি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।

এদিকে বানভাসি ও ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগে পড়েছে। আকস্মিক বন্যায় দুই দিন আগে মহিপুর-কাকিনা সড়কের পাশে দুলাল মেম্বারের উঁচু জমিতে আশ্রয় নেন পূর্ব ইচলী গ্রামের ছাহেরা বেগম। পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে পলিথিনের ছাউনিতে রয়েছেন তিনি। একই জায়গায় আছেন পরিবারের ছয় সদস্যসহ রাশেদা বেগম। তাঁদের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত কেউ খোঁজ নেয়নি। চাল কিংবা কোনো শুকনা খাবারও জোটেনি তাঁদের।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাসলিমা বেগম বলেন, ‘লক্ষ্মীটারী ও কোলকোন্দ ইউনিয়নে ১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ওই চাল এখনো উত্তোলন করেননি।’

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী তবিবুর রহমান ভাঙন এলাকা পরিদর্শন শেষে বলেন, ‘এখনো ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। পূর্ব ইচলী এলাকা রক্ষায় আপাতত জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা