kalerkantho

সোমবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৭ । ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৩ সফর ১৪৪২

১০০ বছরের সেতু ১৬তেই ধস

মোস্তফা মনজু, জামালপুর ও মমিনুল ইসলাম কিসমত, সরিষাবাড়ী   

১০ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১০০ বছরের সেতু ১৬তেই ধস

জামালপুরের সরিষাবাড়ীর ঝিনাই নদের ওপর ভেঙে পড়া শুয়াকৈর সেতু। ফাইল ছবি

সেতুর স্থায়িত্বকাল ১০০ বছর, কিন্তু ১৬ বছরেই ভেঙে পড়ল। এটি জামালপুরের সরিষাবাড়ীর ঝিনাই নদে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০০ মিটার দীর্ঘ শুয়াকৈর সেতু। গত মাসে সেতুর তিনটি স্প্যান দেবে তিনটি গার্ডার ভেঙে পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে সরিষাবাড়ীর সঙ্গে মাদারগঞ্জ উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এলজিইডি ২০০২-০৩ অর্থবছরে গ্রামীণ যোগাযোগ এবং হাট-বাজার উন্নয়ন ও পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় সেতু নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়। এটি শিমলাবাজার-মাদারগঞ্জের শ্যামগঞ্জ- কালিবাড়ী ভায়া সরিষাবাড়ী সড়কে ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের আরসিসি গার্ডার সেতু। সেতুটির কাজের মধ্যে ছিল দুটি এবাটমেন্ট (দুই পারের সংযোগ দেয়াল), ৯টি পিয়ার (পিলার) ও ১০টি স্প্যান (পাটাতন) ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ। ২০০৩ সালের ২৩ জুন এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এই সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ পায় সরিষাবাড়ীর আরামনগর বাজারের ঠিকাদার সোহরাব হোসেনের প্রতিষ্ঠান মেসার্স রশিদ অ্যান্ড সন্স।

ওই সময় স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী এক পক্ষের নেতারা প্রভাব খাটিয়ে কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চুক্তিতে সেতু নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁরা তৎকালীন সরিষাবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আজিম উদ্দিন আহমেদের ছেলে মো. আক্তারুজ্জামানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএইচ এন্টারপ্রাইজ। ঠিকাদার আক্তারুজ্জামান সেতু নির্মাণকাজ শুরু করেও বেশি দূর এগোতে পারেননি। নির্মাণকাজে সময়ক্ষেপণ ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ তুলে স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী আরেকটি পক্ষ ফের প্রভাব খাটিয়ে প্রথম কার্যাদেশ পাওয়া মেসার্স রশিদ অ্যান্ড সন্সের ঠিকাদারি চুক্তি বাতিল করায়। কিন্তু মূল ঠিকাদার রশিদ অ্যান্ড সন্স সেতুটির ৫৫ শতাংশ কাজ সম্পাদন করেছে মর্মে কাজটির প্রাক্কলিত ব্যয়ের এক কোটি ৭৫ লাখ টাকার মধ্যে ৭১ লাখ ৬৯ হাজার টাকার বিলও তুলে নেয়।

এরপর আরো দুটি অর্থবছর পর ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে সেতুটির বাকি ৪৫ শতাংশ কাজ করানোর জন্য  ফের দরপত্র আহ্বান করে এলজিইডি। দরপত্রের মাধ্যমে আরো এক কোটি ৩১ লাখ টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে সেতুর বাকি কাজের জন্য ২০০৬ সালের ২৮ মার্চ কার্যাদেশ পায় সরিষাবাড়ীর চাপারকোনার ঠিকাদার বেলাল হোসেনের প্রতিষ্ঠান মেসার্স বি কে এন্টারপ্রাইজ। বি কে এন্টারপ্রাইজ ওই বছরের নভেম্বরের মধ্যে সেতুর অসমাপ্ত কাজ শেষ করে বিল তুলে নেয়।

প্রকৌশল বিভাগের তথ্য মতে, সেতুটির স্থায়িত্বকাল নির্ধারিত ছিল ১০০ বছর, কিন্তু মাত্র ১৬ বছরের মধ্যেই স্প্যান দেবে গিয়ে নদে বিলীন হতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে গত ২১ ও ২২ জুলাই তিনটি স্প্যান দেবে গিয়ে ওপর থেকে প্রতিটি ২০ মিটার দৈর্ঘ্যের তিনটি গার্ডার ভেঙে পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সরিষাবাড়ী উপজেলা সদরের সঙ্গে কামরাবাদ ইউনিয়ন ও মাদারগঞ্জের আদারভিটা ইউনিয়নের অন্তত ২৫টি গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামে লক্ষাধিক মানুষ বাস করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পিলারের পাইলিং কাঠ দিয়ে করায় শুরুতেই গলদ ছিল। অন্যদিকে ঠিকাদারের গাফিলতি ও সময়ক্ষেপণে শক্ত ভিতের ওপর সেতুটি নির্মিত হয়নি। তখন সেতু নির্মাণ নিয়ে অনিয়মেরও অভিযোগ করেছিল গ্রামবাসী। অন্যদিকে প্রভাবশালীরা ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে সেতুর কাছ থেকে বালু তোলার কারণেও পিলারের ভিত দুর্বল হয়ে যায়। ফলে বন্যার পানির তোড়ে তিনটি গার্ডারসহ স্প্যান দেবে গেছে। বাকি সাতটি স্প্যান দেবে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই সেতু নির্মাণের প্রথম ঠিকাদার মো. সোহরাব হোসেন ও দ্বিতীয় ঠিকাদার মো. বেলাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা কালের কণ্ঠ’র কাছে এই সেতুর কাজ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তাঁরা সঠিকভাবেই যাঁর যাঁর অংশের কাজ করে বিল তুলেছেন বলে দাবি করেছেন।

এলজিইডির জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী মো. সায়েদুজ্জামান বলেন, সেতুটির স্থায়িত্বকাল ছিল ১০০ বছর। সেতুটির মূল নথিপত্রও পাওয়া যাচ্ছে না। তখনকার প্রকল্পের অগ্রগতির প্রতিবেদন বইয়ে প্রথম ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করে ফের দরপত্রের মাধ্যমে আরেকজন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে সেতু নির্মাণে অনিয়ম হয়েছিল কি না, এখন তা বলা খুব মুশকিল। বন্যার পানির তোড়ে সেতু ভেঙে পড়ার কারণ দেখিয়ে ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ ঢাকায় এলজিইডির সদর দপ্তরে পাঠিয়েছি। সেতুর ভাঙা অংশ ফের নির্মাণ করা যাবে, নাকি নতুন করে সেতু নির্মাণ করতে হবে, নদের পানি না কমা পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা