kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

ধর্ষণের গ্রাম!

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি সদস্য বজলুর রহমানই সব ঘটনা মীমাংসা করেন

এম আর মাসুদ, ঝিকরগাছা (যশোর)   

৯ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যশোরের ঝিকরগাছার একটি গ্রামে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। গত ছয় মাসে অন্তত পাঁচটি ধর্ষণের খবর প্রকাশ পেয়েছে। তবে মামলা হয়েছে মাত্র একটি। বাকিগুলো মীমাংসা করা হয়। 

ধর্ষণের শিকার বেশির ভাগই শিশু ও কিশোরী। এ কারণে এ গ্রামের অন্য অভিভাবকরাও তাঁদের সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। বিচার না হওয়ার কারণেই একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে বলে মন্তব্য তাঁদের।

অভিযোগ আছে, ধর্ষণের ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে ধর্ষকরা পার পেয়ে যাচ্ছে। আর প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে গিয়ে মামলা করতে সাহস পাচ্ছে না ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই গ্রামে ধর্ষণের সর্বশেষ শিকার হয়েছে তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রী। গত ১৬ জুলাই আমিনুর রহমান ওরফে কবিরাজ আমিনুর শিশুটিকে ডেকে নিয়ে বাড়ির সিঁড়ির নিচে ধর্ষণ করেন। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে স্থানীয়রা জোর চেষ্টা চালালেও শিশুটির মা আদালতে মামলা করেন। বর্তমানে আমিনুর জেলহাজতে রয়েছেন। তবে প্রভাবশালীদের চাপ অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছেন বাদী।

ওই গ্রামের আরেক অভিভাবক জানান, কবিরাজ আমিনুর এর আগেও এ রকম ঘটনা ঘটিয়েছেন, কিন্তু কিছুই হয়নি।

এ ছাড়া শাহজাহান আলী (৫০) নামে এক ব্যক্তি বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাঁরই মেয়ের বান্ধবী অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে দুই বছর ধরে ধর্ষণ করেন। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ওই ছাত্রী তার মাকে ঘটনা খুলে বলে।

ওই ছাত্রীর মা বলেন, ‘আমি এ ঘটনায় কোনো বিচার পাইনি। আমরা গরিব বলে সবাই বিষয়টি এড়িয়ে যায়, মামলা করতে দেয়নি। শেষে কিছু টাকা দিয়ে প্রভাবশালীরা বলেন ঘটনা জানাজানি হলে মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে।’ এ ঘটনার পর ওই ছাত্রীর লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে বলে তিনি জানান।

একই দিনে আরেক গ্রামের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে রাস্তা থেকে তুলে এনে একটি মাঠে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন বাঁকুড়ার টিটু, জগদানন্দকাটির সুজন, সাতক্ষীরার কলারোয়ার সাজু ও ইয়াছিন। পরে এলাকাবাসী অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর বাবা সুষ্ঠু বিচার চাইলেও স্থানীয় মাতবররা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেন। এ ঘটনার পর ওই ছাত্রীর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান তার বাবা।

গত ২ জুলাই এক মালয়েশিয়াপ্রবাসীর ছেলে হুমায়ন কবির (২৬) তালের শাঁস খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে আট বছরের এক শিশুকে বলাৎকার করেন। শিশুটির পরিবার হতদরিদ্র হওয়ায় ন্যায়বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও গ্রাম্য মাতবর উল্টো তাদের কাছে টাকা চান মামলা করতে। শেষে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ‘ম্যানেজ’ হওয়ায় বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি সদস্য বজলুর রহমানই সব ঘটনা মীমাংসা করেন।

তবে ইউপি সদস্য বজলুর রহমানের দাবি, ‘ধর্ষণের মতো ঘটনায় যদি ভুক্তভোগীর পরিবার আইনের আশ্রয় না নেয়, তাহলে তাঁর কিছু করার থাকে না।’

ইউপি চেয়ারম্যান নিছার উদ্দীন স্বীকার করেন যে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এসব ঘটনা চাপা পড়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে পরিষদের আগামী সভায় আলোচনা করা হবে বলে তিনি জানান।

উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা নাসরিন আখতার সুলতানা বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনায় অবশ্যই আইনের আশ্রয় নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে ভিকটিমকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর যাবতীয় সহযোগিতা করবে।’

ঝিকরগাছা থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মামলা না হলে, ঘটনা জানতে না পারলে পুলিশের কিছু করার থাকে না। এ জন্য এলাকাবাসীর সচেতন হতে হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত রহমান বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা কমিটির আগামী সভায় তোলা হবে। এমন ঘটনা আর যেন না ঘটে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা