kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

তিস্তার গর্জনে বিধ্বস্ত দহগ্রাম

সর্বস্বান্ত মানুষ, ঘরে ঘরে কান্না

হায়দার আলী বাবু, লালমনিরহাট   

১৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



তিস্তার গর্জনে বিধ্বস্ত দহগ্রাম

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রামে তিস্তার পানি উপচে ঢুকে পড়ে আবাদি জমি ও বসতি এলাকায়। পানির সঙ্গে এসেছে বালুও। বালুতে ঢাকা ফসলের মাঠ। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভারত থেকে আসা ঢলে তিস্তা নদীর পানি হঠাৎ ফুলে-ফেঁপে উঠে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রামকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। ইউনিয়নের সর্দারপাড়ার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও সেতু বিধ্বস্ত করেছে। গত রবি ও সোমবারের পানির তোড়ে বিদ্যুতের খুঁটি পর্যন্ত উপড়ে গেছে। বালুতে ঢেকে গেছে বিস্তীর্ণ রোপা আমনের ক্ষেত। সর্দারপাড়ার পাশাপাশি দগ্রহামের তিস্তাতীরবর্তী কাতিপাড়া, সৈয়দপাড়া ও মুন্সীপাড়া এলাকাতেও একইভাবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সর্বস্বান্ত হয়ে দহগ্রামবাসীর ঘরে ঘরে এখন চলছে কান্নার রোল।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, গত রবিবার রাতে তিস্তার পানি ব্যারাজ (ডালিয়া) পয়েন্টে বিপত্সীমার সর্বোচ্চ ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সেদিন ব্যারাজ এলাকায় জারি করা হয় সর্বোচ্চ সতর্কতা। আশপাশের লোকজনকে নিরাপদে সরে যওয়ার জন্য মাইকিং হয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বিপত্সীমার সর্বোচ্চ ৪৫, ৪৩, ৪০ ও ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছিল।

গত দুই দিন তিস্তার পাড়ে গিয়েও পাউবোর তথ্যের সত্যতা মিলেছে। নদীপারের লোকজন বলছে, এর আগে তিস্তার এমন হিংস্র রূপ দেখেনি তারা।

সর্দারপাড়ার অবস্থান চারদিকে ভারতঘেরা একসময়ের আলোচিত ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায়। ভারত থেকে এসে সেখানেই প্রথম দেশের মাটি ছুঁয়েছে তিস্তা। এরপর তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট গলিয়ে লালমনিরহাট হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে মিশেছে।

সীমান্ত লাগোয়া সর্দারপাড়ার জহর আলী বলেন, ‘রবিবার সকাল ১০টার দিকে নদী উপচে ফসলের ক্ষেত বেয়ে আমাদের পাড়ার দিকে পানি আসতে থাকে। আমরা নিজেদের গরু-ছাগল, সংসারের জিনিসপত্র নিরাপদে রাখার চেষ্টা শুরু করি। শুরুতে এমনটা হবে বুঝতে পারিনি। তা ছাড়া আমাদের কেউ সাবধানও করেনি। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে নদীর পানি ঢলে পরিণত হয়ে হিংস্র রূপ নিয়ে আমাদের দিকে ধেয়ে আসে। এরপর নিমেষেই সব কিছু ধ্বংস করে দেয়। আমার ৫১ বছর বয়সেও তিস্তার এই রূপ দেখিনি।’

দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ এলাকার ডালিয়ার নদীর পারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নুরুল ইসলামের। ২৯ বছর ধরে ‘গেজ রিডার’ হিসেবে চাকরি করছেন ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডে। তাঁর কাজ তিস্তার পানিপ্রবাহ পরিমাপ করা। তিনি বলেন, ‘তিস্তার পানির এই ঢল আগে কখনো দেখিনি। এবার পানির ঢল দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’

স্থানীয় বাসিন্দা জীবন আলী বলেন, ‘পানির স্রোত সব কিছু ভেঙেচুরে নিয়ে গেছে। পানির তীব্র স্রোতে উঁচু জমি এখন খালে পরিণত হয়েছে। আমার ১০ বিঘা জমির ধান বালুতে ঢেকে গেছে।’

রাহেদুল ইসলাম নিজের ধসে যাওয়া আধাপাকা বাড়ি দেখিয়ে বলেন, ‘বাড়ির পাশে কোনো দিন তিস্তার পানি দেখিনি; কিন্তু গত রবিবার এমনভাবে পানি এলো যে অনেক কষ্টে নির্মাণ করা আমার নতুন বাড়ি ভেঙে গেছে।’

দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল হোসেন প্রধান বলেন, ‘তিস্তার বাম তীরে দহগ্রাম আর ডান তীরে ভারত। সম্প্রতি ভারতের বেলতলি এলাকায় বাঁধ দেওয়া হয়েছে। ফলে পানির ঢল বাম তীরের ওপর দিয়ে গেছে।’

পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ‘আমি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। তিস্তার বাম তীরে একটি বাঁধ দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ৮২৫টি পরিবারকে সহায়তা করা হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা