kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

করোনা পরীক্ষাবঞ্চিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ

কৌশিক দে, খুলনা   

১১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনাভাইরাস সংক্রমণকালে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জীবন নির্বাহসহ নানা কাজে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে সমাজের পিছিয়ে পড়া তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী (হিজড়া)। হাসপাতালগুলোতে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে আগের মতো জীবন-জীবিকা নির্বাহের কাজেও নামতে পারছে না তারা। করোনা পরীক্ষার ফরম পূরণে পুরুষ-স্ত্রী লৈঙ্গিক পরিচয় প্রদানের ছক থাকলেও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর পরিচয় দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে কভিড-১৯ পরীক্ষা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে এই জনগোষ্ঠী।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয়ভাবে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তৃণমূল পর্যায়ে তার প্রভাব পড়ছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে তারা বৈষ্যমের শিকার হচ্ছে। একই সঙ্গে করোনা সংকটকালে জীবন-জীবিকা নির্বাহে অসহায় হয়ে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনায় দুই শতাধিক তৃতীয় লিঙ্গ মানুষ ও চার শতাধিক লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যসম্পন্ন মানুষ রয়েছে। এদের মধ্যে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী নাচ-গান করে মানুষের কাছ থেকে অর্থ চেয়ে জীবিকা নির্বাহ করে, যেটি সংস্কৃতি হিসেবে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু বর্তমানে এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তারা কোনো কিছুতেই অংশগ্রহণ করতে পারছে না। আবার লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা ছোটখাটো হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রিকশা-ভ্যান চালনাসহ অন্যান্য কাজ করলেও তা এখন অনেকটাই কমে গেছে। অন্যদিকে জেলার সাড়ে পাঁচ শতাধিক যৌনকর্মীও কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

অন্যদিকে করোনা চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে হিজড়া ও লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা। সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই তাদের করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসাপ্রাপ্তির সুযোগ নেই। অভিযোগ রয়েছে, করোনা পরীক্ষার ফরমেও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পৃথক কোনো ঘর (ছক) নেই।

খুলনায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে কাজ করা ছিন্নমূল মানবকল্যাণ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন বলেন, ‘বৈশ্বিক দুর্যোগে খুলনার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বলে পরিচিত হিজড়া, লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যসম্পন্ন ব্যক্তি ও যৌনকর্মীরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাঁরা মূলত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তাঁদের জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা অপ্রতুল। তাঁদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে ভাবতে হবে। আমরা অসহায় হিজড়াসহ অন্যদের বিষয়ে কিছু করার চেষ্টা করছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি স্বীকৃতি সত্ত্বেও চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠী বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। এখন করোনা পরীক্ষার যে ফরম সরবরাহ করা হয়, তাতে তৃতীয় লিঙ্গের কোনো ছক নেই বা কোনো পরিসংখ্যানে এই জনগোষ্ঠীর কথা উঠে আসছে না।’

খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নক্ষত্র মানবকল্যাণ সোসাইটির সভাপতি পাখি দত্ত বলেন, ‘করোনাভাইরাসের প্রভাবের পর আমাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো আয়-রোজগার নেই। মানবেতর জীবন যাপন করছি আমরা। খুলনায় ২২০ জন হিজড়া আছে। জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা দপ্তর থেকে তাদের কিছু সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আমাদের নিজেদের সংগঠন থেকেও দিচ্ছি; কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।’

স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি পাখি দত্ত আক্ষেপ করে আরো বলেন, ‘অসুস্থ হলেও আমাদের সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ নেই। সেখানে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য গেলেও সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।’

তবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা বৈষম্যের বিষয়ে খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে সমাজসেবা অধিদপ্তর খুলনার উপপরিচালক খান মোতাহার হোসেন বলেন, ‘আমরা করোনা দুর্যোগকালে দুই দফায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিয়েছি। তবে প্রয়োজনের তুলনায় সেটি অনেকটা কম। সমাজসেবা দপ্তর খুলনা থেকে ছয়জন হিজড়াকে নিয়মিত ঘরভাড়া দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ২০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মূলধারায় ফেরানো হয়েছে। আমরা এই জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প পেশা সৃষ্টি, প্রশিক্ষণসহ নানা কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা