kalerkantho

রবিবার। ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭। ৯ আগস্ট ২০২০ । ১৮ জিলহজ ১৪৪১

চাকরি হারিয়ে গ্রামে দুই লাখ মানুষ

রংপুরে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনা দুর্যোগে চাকরি হারিয়ে রংপুর অঞ্চলের দুই লক্ষাধিক মানুষ বিভিন্ন কর্মস্থান থেকে এরই মধ্যে গ্রামে চলে গেছেন। অন্য পেশায় নিয়োজিত স্বল্প আয়ের মানুষরাও অর্থ সংকটে ভাড়াবাসা ছেড়ে দিয়ে গ্রামের পৈতৃক ভিটাতে ফিরেছে। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। তা ছাড়া দ্রুত বিকল্প কর্মসংস্থান না হলে গ্রামেও ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করছেন উন্নয়ন গবেষকরা।

করোনার থাবায় এমনিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছে গ্রামাঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। কর্মহীন হয়ে পড়া এসব মানুষের সঞ্চয় এরই মধ্যে ফুরিয়ে এসেছে। এতে অর্থনৈতিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সমাজের নানা স্তরে। মানুষের মনে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। ভর করছে এক অজানা শঙ্কা। এর ওপর চাকরি হারানো বিশাল অঙ্কের জনগোষ্ঠী গ্রামে যুক্ত হওয়ায় কাজের আকাল দেখা দিয়েছে। অভাব-অনটনে পড়ে অনেকেই জীবিকার তাগিদে অসৎ পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

রংপুরের সবচেয়ে অভাবী এলাকা হিসেবে পরিচিত গঙ্গাচড়া। এলাকায় কাজ না থাকায় এখানকার তিস্তার ভাঙনে সর্বস্বান্ত হওয়া পরিবারের প্রধানরা আয়ের সন্ধানে বছরের বেশির ভাগ সময় থাকতেন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। সেখানে তাঁদের বেশির ভাগ কৃষি শ্রমিক কিংবা নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু করোনার এ সময়ে সেখানে কারোরই আর কাজ মিলছে না। কাজ-চাকরি হারিয়ে বাধ্য হয়ে তারা ফিরে এসেছেন বেকারত্বের এলাকা নিজ গ্রামে।

চাকরিহারা তিস্তার চরের আব্দুল মতিন ঢাকার শাহবাগে একটি ছোট্ট গার্মেন্টে কাজ করতেন। করোনায় ওই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়িতে ফিরে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘কয় বছর থাকি ওইখানে চাকরি করি কোনো মতে সংসার চলছিল। এ্যালা বাড়িত বসি আছি, কোনো কাম (কাজ) নাই। বউ-ছাওয়া নিয়া খুব কষ্টে আছি।’

গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনয়নের চরগ্রাম জয়রাম ওঝা। এখানকার ইউপি সদস্য দুলাল মিয়া জানান, এই চরে ৮০০ পরিবারের বাস। জীবিকার তাগিদে ৬০০ পরিবারের প্রধানই বছরের বেশির ভাগ সময় কাজের সন্ধানে ছুুটে যান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। কাজ না থাকায় বর্তমানে তাঁরা সবাই বাড়িতে ফিরে এসেছেন। বেকার হয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে অনেকেই।

রংপুর নগরীর তাজহাট এলাকার হাসেন আলী (৫৫) ঢাকার ওয়ারীতে একটি প্রেসে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতেন। প্রতি মাসে বেতন পেয়ে বাড়িতে টাকা পাঠাতেন। দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। প্রেস খোলার কথা থাকলেও আর খোলেনি। সেই সঙ্গে তাঁকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এখন খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন তিনি।

তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী এলাকার জবেদা খাতুন (৪২) ঢাকায় একটি বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। করোনা আতঙ্কে বাড়িওয়ালা তাঁকে কাজ থেকে বাদ দেওয়ায় নিজ এলাকায় ফিরে এসেছেন। স্বামী পরিত্যক্ত এই নারী এক সন্তান নিয়ে এখন দিশাহারা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, সন্তানকে নিয়ে অন্যের জমিতে ছোট্ট একটি ঘর করে আছেন তিনি।

উন্নয়ন গবেষকরা বলছেন, করোনাক্রান্তিতে রংপুর বিভাগের আট জেলায় দুই লক্ষাধিক মানুষ চাকরি হারিয়েছে। এসব মানুষ এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে।

রংপুরের উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এখন সরকারি কর্মচারী ছাড়া কেউ ভালো নেই।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কে এম তারিকুল ইসলাম বলেন, শিল্প-কলকারখানার মালিকরা যেন তাঁদের প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে পারেন—সে জন্য সরকার প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। কর্মহীনদের জন্য ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে। এ ছাড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করা হয়েছে। যেহেতু শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চালু হয়েছে, সেখানে অনেক শ্রমিক কাজ করার সুযোগ পাবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা