kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

মাতামুহুরীর বোবা কান্না

চকরিয়ায় খালের পারে দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা
পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে গ্রাম

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাতামুহুরীর বোবা কান্না

পার্বত্য অববাহিকার মাতামুহুরী নদীর একটি শাখা খালের নাম ‘পোঁড়া মাতামুহুরী’। খালটি বিভিন্ন উপখাল হয়ে সরাসরি গিয়ে মিশেছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপকূলের সাগর মোহনায়। এর দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। একসময় খরস্রোতা ছিল এটি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় খালটির পুরোটাই গিলে ফেলেছে দখলবাজরা। পোঁড়া মাতামুহুরীর দুই পার ভরাট করে এটি নালায় পরিণত করেছে। কোথাও কোথাও খালের ওপরই নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন। তাই এখন খালে আর স্রোত নেই। দখলবাজদের দাপটে খালটির ‘বোবা কান্না’ও কেউ শুনছে না।

স্থানীয়রা জানায়, উপজেলার বিএমচর ও পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের বুক চিরে বহমান পোঁড়া মাতামুহুরী। দুই ইউনিয়নের গ্রামীণ এলাকার যাবতীয় পানি চলাচলের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে এই খাল। কিন্তু ২০ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে খালটি দখল করতে করতে একেবারে সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। ফলে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে তলিয়ে যাচ্ছে গ্রাম। তাই খালটি দখলমুক্ত করতে মাঠে নেমেছে গ্রামবাসী। এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন জানিয়েছে তারা। কিন্তু এখনো পর্যন্ত প্রশাসনিক তৎপরতা পরিলক্ষিত না হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী।

উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের বেতুয়া বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সড়কের দক্ষিণাংশে অবস্থিত খালটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি বহুতল ভবন। এসব ভবনে রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিওর শাখা অফিস।

ভূমি অফিসের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, খালটি পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নিয়ন্ত্রণাধীন। বিগত সময়ে মৎস্য চাষ ও অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের শর্তে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে কেউ কেউ এর অংশবিশেষ লিজ নেয়। এরপর লিজগ্রহীতারা খালের ওপর গড়ে তোলে বহুতল ভবন। এ ক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের উেকাচে ম্যানেজ হয়ে নীরব থাকেন বলে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে।

প্রবহমান এই খালের ওপর বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদীন ও তাঁর ভাই নেজাম উদ্দিন। আরো রয়েছেন স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তা শোয়াইবুল ইসলাম, পরিবহন শ্রমিক নেতা রেজাউল করিম, কৈয়ার বিল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সাহাব উদ্দিন প্রমুখ।

খাল দখলকারী স্কুল শিক্ষক জয়নাল আবেদীন দাবি করে বলেন, ‘এটি কোনোকালেই খাল ছিল না। তবে ছড়ার মতো ছিল। আমার বাবা সেখানে দোকান করতেন। ২০১৩ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জায়গাটি লিজ নিয়েছি। তবে পানি চলাচলের সুবিধাও রেখেছি। এ জন্য ভবনের নিচে বেশ কয়েক ফুট উম্মুক্ত রেখেছি, যাতে পানি চলাচল করতে পারে। ২০২৫ সালে আমার লিজের মেয়াদ শেষ হবে।’

প্রবহমান এই খালের প্রস্থ ১০০ ফুটের বেশি জানিয়ে বিএমচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম জাহাঙ্গীর আলম ও পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল আরিফ দুলাল বলেন, ২০ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে পোঁড়া মাতামুহুরী খালটি দখল করে ফেলা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে সেখানে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এ অবস্থায় খালটির পুনরুদ্ধার জরুরি হয়ে পড়েছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বলেন, ‘খালটির অবস্থা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে, কোনো প্রবহমান খাল লিজ বা বন্দোবস্ত দেওয়া যাবে না। এর পরও কিভাবে এই খালের অংশ লিজ দেওয়া হয়েছে তা খতিয়ে দেখে বাতিল করা হবে। তা ছাড়া কোথাও খালের ওপর স্থায়ী স্থাপনা তৈরি করা হলে সাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা