kalerkantho

শনিবার । ২০ আষাঢ় ১৪২৭। ৪ জুলাই ২০২০। ১২ জিলকদ  ১৪৪১

‘মেম্বাররে ২০ হাজার টেহা দিছি’

ঈশ্বরগঞ্জে ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীর অভিযোগ

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ   

৩১ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘মেম্বাররে ২০ হাজার টেহা দিছি’

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের রাজিবপুর ইউনিয়নের তিনটি গ্রামের শতাধিক লোক বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পেতে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্যকে টাকা দিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের ভাগ্যে কিছুই জোটেনি বলে অভিযোগ। তাই টাকা উদ্ধার ও ঘটনার বিচার দাবিতে গতকাল বিক্ষোভ করেন তারা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘নিজের ভাঙাচুরা ঘর। বৃষ্টি আইলে ঝরঝরাইয়া পানি পড়ে। জোরে বাতাস আইলে ওপরওয়ালার নাম নেই। একদিকে বেড়া থাকলেও আরেকদিকে নাই। এইভাবেই দিন পার করছি। মেম্বার কইছে সরকারিভাবে ঘর বানাইয়া দিবো। এর লাইগ্যা কিছু টেহা লাগবো। এই আনন্দে প্রথমে পাঁচ হাজার ও পরে আরো ১০ হাজার টেহা দেই। কয়েক মাস পর মেম্বার বাড়িত আইয়া কয় ঘর তো অইছে, অহন মালামাল আনতে আরো পাঁচ হাজার লাগবো। এই অবস্থায় যার কাছ থেকে সুদে ১৫ হাজার আনছি হের কাছ থাইক্যা আরো পাঁচ হাজার আইনা দিছি। দুই বছর গেলেও ঘর নাই।’ কথাগুলো বলেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বিল খেরুয়া গ্রামের মো. কাশেমের স্ত্রী মোছাম্মৎ বেগম। এই টাকা নিয়েছেন রাজীবপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) মো. রইছ উদ্দিন।

তাঁর মতো রামগোবিন্দপুর, রাধাবল্লভপুর ও হরিপুর গ্রামের শতাধিক লোক বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পেতে টাকা দিয়েছেন। তাঁরা গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে টাকা উদ্ধার ও বিচারের দাবিতে জমায়েত হয়েছিলেন একটি চালকলের চাতালে। তাঁদের একজন হরিপুর গ্রামের আবদুল জলিলের স্ত্রী আছিয়া জানান, রইছ উদ্দিনকে স্বামীর জন্য একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়ার জন্য তিন হাজার ১০০ টাকা দেন। পরে প্রতিবন্ধী নাতনি খাদিজার জন্য ভাতার কার্ড করার জন্য দেন তিন হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিবার টাকা নেওয়ার সময় রইছ মুঠোফোনে একজনের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতেন। কথা বলার সময় পরিচয় জানতে চাইলে ফোনের অন্য প্রান্তের ব্যক্তি বড় কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিতেন। কিন্তু সরকারি সুবিধার কোনো কার্ড দিতে পারেননি। সরকারি ঘর বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে তৃতীয়বার তাঁর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা, জমির দলিল ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নেন। কিন্তু ঘর পাননি। শেষে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড তাঁর বাড়ি থেকে আনার সময় ৬০০ টাকা নিয়েছেন। ওই কার্ড দিয়ে দুবার চাল কিনতে পেরেছেন। পরে সেই কার্ড ফেরত নেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দুই হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলে ৩০০ টাকা নেন। আছিয়া বলেন, ‘সমুদয় টাকা অন্যের কাছ থেকে সুদে দাদন এনে মেম্বারের হাতে তুলে দিয়েছি। এখন আমার মেয়েরা পোশাক কারখানায় চাকরি করে সুদ পরিশোধ করছে।’

রামগোবিন্দপুর গ্রামের শেফালি বেগম জানান, তাঁর বিয়ে হয়েছে ভাটি চরনওপাড়া গ্রামে। কয়েক মাস আগে অসুস্থ ভাইকে দেখার জন্য বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। রইছ উদ্দিন তখন তাঁর অসুস্থ ভাইয়ের জন্য একটি সরকারি ঘরের ব্যবস্থা করার কথা বলে একাধিক কিস্তিতে ৪০ হাজার টাকা নেন। ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে পারেননি। ২০ হাজার টাকা ফেরত দিলেও বাকি টাকা এখনো ফেরত দেননি।

চালকল শ্রমিক ওমর ফারুক (২২) অভিযোগ করেন, সরকারি ঘর দেওয়ার কথা বলে ইউপি সদস্য তাঁর কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা নিয়েছিলেন। টাকা দেওয়ার কয়েক দিন পর তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তিনি টাকা ফেরত চেয়ে পাননি। পরে বাবা মারা যান। কিছুদিন পর তাঁর দাদি সমলা খাতুন মারা যান। সমলার ভাতার কার্ড ফেরত নেন ইউপি সদস্য।

অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য রইছ উদ্দিন জানান, যাঁরা অভিযোগ করেছেন, সবাই তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছেন। এখন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সামনে নির্বাচনে পারজিত করার চেষ্টা করছেন।

রাজীবপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোদাব্বিরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়টি তাঁকে কেউ জানাননি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

মন্তব্য