kalerkantho

রবিবার । ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩১  মে ২০২০। ৭ শাওয়াল ১৪৪১

গবাদি পশু মরছে অচেনা রোগে

কিশোরগঞ্জে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক, হাওরাঞ্চল   

৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গবাদি পশু মরছে অচেনা রোগে

অচেনা রোগে অকাতরে মরছে গবাদি পশু। মারা যাচ্ছে শিয়াল, কুকুর এমনকি পাখিও। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, কুলিয়ারচরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর আসছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ মৃত গাভির নমুনা সংগ্রহ করে বসে আছে। কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা পরিস্থিতিতে গণপরিবহন না চলায় পরীক্ষার জন্য ঢাকায় সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সিডিআইএল) সেসব নমুনা পাঠানো যাচ্ছে না। ফলে ঠিক কোন রোগে গবাদি পশুসহ জীবজন্তু মরছে, তা জানা সম্ভব হচ্ছে না। এলাকাবাসীর জিজ্ঞাসা, পশু-পাখিও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় কি না?

লাভের আশায় নিম্ন আয়ের মানুষেরা এনজিও ও মহাজন থেকে ঋণ করে বিদেশি জাতের গাভি কিনে সংসার চালায়। আচমকা এ সম্পদ হারিয়ে তারা চোখে অন্ধকার দেখছে। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলে মৃত অর্ধশত গাভি ও বকনা বাছুরের একটি বড় অংশের মৃত্যু হয়েছে জ্বর ও শ্বাসকষ্টে।

অবসরপ্রাপ্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আব্দুল বাছেত তাঁর নিজ এলাকা কুলিয়ারচরের লক্ষ্মীপুরে এ রোগে আক্রান্ত গাভির চিকিৎসা করেছেন। অভিজ্ঞ এ চিকিৎসকের ভাষ্য, লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা কোনো কাজ করছে না। বাংলাদেশে এর আগে এ ধরনের রোগ চোখে পড়েনি তাঁর। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া মৃত্যুর কারণ বলা যাবে না।

দুই সপ্তাহে শুধু বাজিতপুরে ১৬-১৭টি অস্ট্রেলিয়ানসহ বিদেশি জাতের গাভি মারা গেছে। এর মধ্যে বাজিতপুর পৌর শহরের দড়িঘাগটিয়ায় আটটি ও মিরারবন্দে চারটি, গাজীরচরে দুটি ও বামনগাঁওয়ে একটি করে গাভি ও বকনা বাছুর মারা যায়। তা ছাড়া মির্জাপুর গ্রামে দুটি গাভি মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ওদিকে কুলিয়ারচর পৌরসভার বড়খারচরের বাচ্চু মিয়ার একটিসহ দুটি গাভি এবং লক্ষ্মীপুরে সাতটি গাভির মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার প্রাণিসম্পদ অফিসের একটি দল লক্ষ্মীপুরে গিয়ে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

গত ২৬ মার্চ বাজিতপুর পৌরসভার মিরারবন্দের আকতার মিয়ার দুটি ও বাপ্পারাজের একটি পালিত কুকুর মারা যায়। চলতি সপ্তাহে বেশ কয়েকটি শিয়ালও মারা গেছে।

মিরারবন্দের গৃহবধূ শাহানা বেগম দুটি এনজিও থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দেড় লাখ টাকায় একটি গাভি কিনেছিলেন। গত ২৬ মার্চ গাভিটির ১০৭ ডিগ্রি জ্বর এলে ওই দিনই মারা যায়। গতকাল রবিবার ভোরে তাঁর পাঁচ মাস বয়সী একটি বাছুর মারা গেছে। এসব বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেলেন।

দড়িঘাগটিয়ার হেলাল মিয়ার দুটি গাভি ও বাছুর মারা যায় গত ২৫ ও ২৯ মার্চ। হেলাল মিয়ার ছেলে রয়েল জানান, প্রচণ্ড জ্বর ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছিল। মৃত দুটি গাভির দাম হবে প্রায় দুই লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ইদ্রিস আলীর গাভি দুটি মারা যায় একই দিনে। ইদ্রিস জানান, এক লাখ ৩০ হাজার টাকা দামের গাভি দুটির জ্বর ছিল। আরো তিনটি গাভি জ্বরে ভুগছে। তাঁর স্ত্রী হেনা বেগম বলেন, ‘এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কেনা হয়েছিল এগুলো। ঋণ শোধের আগেই সব শেষ। পাশের ঘরের ইসমাইল মিয়ারও একটি গাভি মারা যায়।

গ্রামের রাজমিস্ত্রি মুরসালিন মিয়ার গাভি মারা যায় দুই সপ্তাহ আগে। তিনি জানান, জ্বর হলে ডাক্তার আসতে না আসতেই দাঁড়ানো থেকে গাভিটি পড়ে মরে যায়। অস্ট্রেলিয়ান জাতের গাভিটির দাম অন্তত তিন লাখ টাকা।

মিরারবন্দের সালেক মিয়া জানান, গ্রামের রমজান মিয়ার জংলার ভেতর তিনি কয়েকটি শিয়াল মরে পড়ে থাকতে দেখেছেন। খোঁজ নিয়ে এ বক্তব্যের সত্যতা মিলেছে। ফুল মিয়া বলেন, এভাবে গরু-বাছুর ও শিয়াল-কুকুর মারা যাওয়ায় তাঁরা ভয়ে আছেন। পশু-পাখির মধ্যে করোনা ছড়ায় কি না, তা পরখ করে দেখা দরকার।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণত বোবাইন নিউমোনিয়া, ইসিমেরাল ফিভার ও থ্রি ডেজ সিকনেস রোগে গরুর মৃত্যু ঘটে। এবার যেভাবে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ামাত্র গরু মরছে, এ দৃষ্টান্ত আগে ছিল না। মৃত গরুর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু টেস্ট করানোর কোনো সুযোগ না থাকায় কী রোগে গরু মরছে, তা বলতে পারছি না।’

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আব্দুল জাব্বার জানান, খোঁজখবর নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মৃত গাভির মালিকদের নাম ও মোবাইল ফোন নম্বরও সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা