kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

যশোর অঞ্চলে কর্মহীন ৫০ হাজার বিড়ি শ্রমিক

‘এখন একবেলা চুলোয় হাঁড়ি চড়াচ্ছি’

যশোর অফিস   

৩ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মেয়ে আনোয়ারা ও দুই নাতি ইমন (১১) ও রুমনকে (৩) নিয়েই স্বামীহারা বৃদ্ধা জবেদা খাতুনের সংসার। মা-মেয়ে দুজনই পেশায় হাতে তৈরি আকিজ বিড়ি কারখানার শ্রমিক। দুজন বিড়ি তৈরি করে দিনে ৩০০-৩৫০ টাকা আয় করেন। তা দিয়েই চলে তাঁদের সংসার। এর মধ্যে নাতি ইমন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তাঁরা থাকেন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারণ কুন্দিপুর লাইনপাড়ায় রেললাইনের পাশের বস্তিতে। কষ্ট হলেও বিড়ি বানানোর আয় দিয়ে খেয়ে-পরে যাচ্ছিলেন তাঁরা। কিন্তু করোনাভাইরাস তাঁদের আয়ের পথ কেড়ে নিয়েছে। ভাইরাসের থাবায় আট দিন ধরে কারখানা বন্ধ।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিন কুন্দিপুর এলাকায় গেলে কথা হয় জবেদা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মাইয়ের স্বামী থাইকেও নেই। আরাট্টা বিয়ে কইরে সেই বউ নিয়ে থাকে। কোনো খরচও দেয় না। মা-মেয়ে মিলে যা আয় করি, তা দিয়ে নাতিগের নিয়ে কোনো রকমে খাইয়ে-পইরে বাঁইচে ছিলাম। কিন্তুক করোনা আইসে আইজ আট দিন আমাগের কাজ কাইড়ে নেছে। এখন দিনি শুধু একবার কোনোরকমে চুলোয় হাঁড়ি চড়াচ্ছি। এরপর আর কোনতে হাঁড়ি চড়াবো? ছোট ছোট নাতি দুডো আর মাইয়েরে কী খাওয়াবো বুঝতি পাততিছিনে।’

বিড়ি শ্রমিকদের একটা বড় অংশ বসবাস করে কুন্দিপুর এলাকায়। তাদের বেশির ভাগই নারী। একসময় এদের অনেকে বিভিন্ন পণ্য চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারপর একপর্যায়ে সেই পথ ছেড়ে তারা বিড়ি তৈরি করে সংসার চালাত।

এখানে কথা হয় আরেক বিড়ি শ্রমিক কুলসুম বেগমের সঙ্গে। তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে ভারতে আটকা। দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। তিনি বলেন, ‘কারখানা বন্ধ। মানুষির বাড়ি কাজ করতি চালি মানুষ করোনার ভয়তে কাজেও নিতি চাচ্ছে না। বাড়িতি ঢুকতি তাই দেচ্ছে না। কাজ না থাকলি ছেলে পিলেগের সামনের দিন খায়াবো কী?’

বিড়ি শ্রমিক সায়রা বেগম বলেন, ‘আমাগের তো দেড়ি (সঞ্চয়) নাই। সামনের দিনি খাবো কী? করোনায় না মরলিও কাজ না করতি পাইরে না খাইয়ে মরার জো হচ্ছে।’

তাঁরা জানালেন আজ পর্যন্ত তাঁরা বা এলাকার কোনো বিড়ি শ্রমিক সরকারি বা মালিকপক্ষ থেকে খাদ্য বা আর্থিক কোনো সহযোগিতা পাননি। শুধু তাঁরাই নন, বর্তমানে কর্মহীন যশোর অঞ্চলের সব বিড়ি শ্রমিকেরই এমন করুণ অবস্থা।

বাংলাদেশ বিড়ি শ্রমিক ফেডারেশনের দক্ষিণাঞ্চলের আহ্বায়ক ফজলুর রহমান বলেন, যশোরে আকিজ বিড়ি কারখানায়ই প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ করে। তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের কয়েক হাজার মানুষ। করোনার কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে আকিজ বিড়ি কারখানা বন্ধ। পাশাপাশি যশোর, কুষ্টিয়া, বাগেরহাটসহ দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সংসার খরচ চলে বিড়ি তৈরির আয় দিয়ে। বর্তমানে কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা মানবেতর দিন যাপন করছে। এ অবস্থায় সরকার ও মালিকপক্ষের সহযোগিতা ছাড়া তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই দুর্দিনে মালিকপক্ষ থেকে বিড়ি শ্রমিকরা কোনো সহযোগিতা না পাওয়ার বিষয়ে আকিজ বিড়ি কারখানার ম্যানেজার শান্ত বলেন, মালিকের ইচ্ছা থাকার পরও তাদের সহযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের বৈষম্যমূলক শুল্কনীতির কারণে হাতে তৈরি বিড়ি রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো ও জাপান টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজ তাদের সিগারেট উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে এবং তাদের মজুদকৃত সিগারেট বাজারজাত করছে। তাতে বিড়ি কারখানা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় দ্রুত উৎপাদন চালু করতে না পারলে কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাতে হাজার হাজার শ্রমিক স্থায়ীভাবে বেকার হয়ে পড়বে।

এদিকে গতকাল সকালে নাভারণে আকিজ বিড়ি কারখানার সামনে বিড়ি শ্রমিকরা সরকারের খাদ্য সহায়তা পেতে মানববন্ধন করেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা