kalerkantho

সোমবার । ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ১  জুন ২০২০। ৮ শাওয়াল ১৪৪১

রাজধানীর বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল মানুষ বিপদে

লায়েকুজ্জামান   

২ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাজধানীর বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল মানুষ বিপদে

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে ছুটি ঘোষণার পর বিপদে পড়েছে রাজধানীর বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল মানুষ। তাদের বেশির ভাগের আয়ের উৎস ছিল বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করা, রিকশা চালানো, বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় মসলা বাটা, পানি সরবরাহ করা, কাগজ ও পানির বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করা, ঘুরে ঘুরে পান, বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করা, বিভিন্ন বেসরকারি অফিস ও দোকানে ফুটফরমাশ খাটা।

বস্তিবাসীরা নির্দিষ্ট জায়গায় বসবাস করলেও ফুটপাতে থাকা মানুষজন পড়েছে বেশি বিপদে। তাদের আয়-রোজগারের সব পথ এখন বন্ধ। এমনকি ভিক্ষা পাওয়ারও সুযোগ নেই।

এ ছাড়া বস্তিবাসী ও ছিন্নমূলদের বেশির ভাগ ঢাকা শহরের ভোটার নয়।

গত মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে খাদ্যের আশায় বসে থাকা ওই সব ছিন্নমূল মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের সংকটের কথা।

মৎস্য ভবনের উল্টো দিকে বার কাউন্সিল ভবনের দেয়াল ঘেঁষে আধশোয়া অবস্থায় পড়ে ছিলেন এক মধ্যবয়সী নারী। বারবার নাম জানতে চাইলেও সেটা বলার মতো শক্তিও যেন তাঁর নেই। তাঁর পাশেই বসে ছিল আরো ১০-১১ জন নারী পুরুষ। সবাই ক্ষুধার্ত। অন্যরা ওই নারীকে দেখিয়ে দিয়ে বলল, তিনি দুই দিন ধরে কোনো খাবার পাননি। তাঁকে যেন কিছু সাহায্য দেওয়া হয়—সে অনুরোধও করল তারা।

জানা যায়, ওই নারী পল্টনের একটি হোটেলে মসলা বাটার কাজ করতেন। এখন হোটেল বন্ধ, কাজ নেই, খাবারের সংস্থানও নেই। তাঁর পাশে বসা হায়দার আলী নামের এক যুবক, যিনি নিজেও অনাহারে কাতর। জানালেন, তিনি বলাকা পরিবহনের বাসে চালকের সহকারীর কাজ করতেন। বাস বন্ধ হওয়ায় তাঁর আয়ের পথ বন্ধ। ঘরে স্ত্রীসহ দুই সন্তান।

অশ্রুসজল চোখে হায়দার জানান, ক্ষুধার যন্ত্রণায় দুই সন্তানের কান্না সহ্য করতে না পেরে এখানে এসে বসে আছেন। শুনেছেন, মাঝে মাঝে কারা যেন রান্না করা খাবার নিয়ে আসে সেখানে, সে জন্যই বসে থাকা।

মিরপুরের নান্নু মার্কেটের সামনে সড়কে বসে ছিলেন পারভীন নামের এক বয়স্ক নারী। ওই এলাকার একটি বাসায় বুয়ার কাজ করতেন। দেশে করোনা সংক্রমণের পর বাড়ির মালিক বিদায় করে দিয়েছেন। আগে ছিলেন বাউনিয়া বাঁধের একটি বস্তিতে। সম্প্রতি বস্তিটি পুড়ে যাওয়ায় এখন তিনি একেবারে গৃহহীন। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাঁর অবস্থা জেনে চারটি পাউরুটি, দুই কেজি চাল ও আধা কেজি ডাল, সঙ্গে কিছু লবণ ও তেল দিয়েছেন।

রাজধানীতে সরকারি ও ব্যক্তিগত ত্রাণ বিতরণের মূল কাজটা করছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলরা। জানা গেছে, কাউন্সিলরা তাঁদের এলাকায় বসবাসকারী দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের লোকজনের তালিকা করে তাদের বাড়িতে বাড়িতে চাল-ডাল, আলু, তেলসহ খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে শুরু করেছেন।

গত মঙ্গলবার ঢাকা উত্তরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইসমাইল মোল্লাকে দেখা যায় তিনি নিজের অর্থে ৭০ টন চাল-ডালসহ খাদ্যসামগ্রী ব্যাগ ভর্তি করে এলাকার তালিকাভুক্তদের বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন। একইভাবে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন উত্তরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী ও ৫১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহম্মদ শরিফুর রহমান।

জানা গেছে, যারা ভোটার, কোনো না কোনো এলাকায় বসবাস করে শুধু তারাই সহায়তা পাচ্ছে। বাদ পড়ছে ছিন্নমূল, মানে সড়কে, উদ্যানে অলিগলিতে খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারীরা। এ ধরনের মানুষের প্রকৃত সংখ্যা কত তার সঠিক কোনো তালিকা নেই সরকারের কাছে। সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরো যে শুমারি করেছে সেখানে সড়ক বা উদ্যানে খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারী মানুষকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে বস্তির সঙ্গে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা এ কে এম লুৎফর রহমান সিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১৪ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরো একটি শুমারি করেছে। ওই শুমারি অনুসারে ঢাকা দক্ষিণে তখন ছিন্নমূল মানুষ ছিল এক লাখ ৩৭ হাজার।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বস্তি উন্নয়ন ও সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা তাজিনা সরোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকা উত্তরে এক লাখ ৫০ হাজার ছিন্নমূল পরিবার রয়েছে।

ঢাকায় ছিন্নমূল মানুষদের নিয়ে সাজেদা ফাউন্ডেশনের ‘আমরাও মানুষ’ নামে একটি প্রকল্প কাজ করে। ওই প্রকল্পের সমন্বয়কারী এম ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকা শহরের দেড় কোটি মানুষের মধ্যে বর্তমানে অনুমানিক ২০ থেকে ২২ হাজার লোক ফুটপাতে বসবাস করে এবং তাদের অনেকে ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে ফুটপাতে বসবাস করছে। মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণার আগে সংখ্যাটি আরো বেশি ছিল। তাঁর ভাষ্য, ফুটপাতে থাকা লোকগুলোই খাবারের অভাবে এখন চরম বিপদে আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এদের সঠিক সংখ্যা সম্ভবত আলাদা করা নেই। আলাদা তালিকা তৈরি করে এলাকাভিত্তিক ভাগ করে সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগী ব্যক্তিদের সম্মিলিতভাবে তাদের খাওয়ানোর দায়িত্ব নিতে হবে। না হলে এখন যেভাবে চলছে তাতে কেউ পাবে কেউ পাবে না—এটাই হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা