kalerkantho

সোমবার । ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ১  জুন ২০২০। ৮ শাওয়াল ১৪৪১

খেটে খাওয়া মানুষ বিপদে এমপি-নেতারা হাত গুটিয়ে

রাজশাহীতে ধারদেনা করে চলছে নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খেটে খাওয়া মানুষ বিপদে এমপি-নেতারা হাত গুটিয়ে

রাজশাহীর দুর্গাপুরের আমগাছী গ্রামের আনারুল ইসলাম পেশায় ভ্যানচালক। পাঁচ দিন ধরে ভ্যান চালাতে পারেননি রাস্তায়। এরই মধ্যে বাসায় যে দু-তিন কেজি চাল ছিল, তাও শেষ হয়ে গেছে। আনারুলের স্ত্রী প্রতিবেশীদের কাছ থেকে চাল ধার করে দুই দিন ধরে সংসার চালাচ্ছেন। কিন্তু ভাত খেতে তো তরকারি প্রয়োজন। সেটি পাবেন কোথায়! তাই বাধ্য হয়ে দুই কেজি আলু কিনে ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে দিন পার করছে আনারুলের পরিবার।

আনারুল জানান, তাঁদের গ্রামে সরকারের উদ্যোগে ১০ কেজি করে চাল পেয়েছে কিছু মানুষ। তবে বেশির ভাগ গরিবই এখনো সেই চাল পায়নি। আবার যারা চাল পেয়েছে, তারা এরই মধ্যে তরকারি সংকটে পড়েছে। এভাবে আর কত দিন! এ নিয়ে কঠিন দুশ্চিন্তায় পড়েছে এসব মানুষ।

কিন্তু এখনো এ গ্রামে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি। এমনকি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে উপজেলা চেয়ারম্যান বা সংসদ সদস্যও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সহায়তার হাত বাড়াননি। ফলে শুধু সরকারি সহায়তার দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে গ্রামবাসীকে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক হারে। অনেকেই এলাকার নাম ধরে ধরে ফেসবুকে সেই এলাকার এমপিদের নীরবতার বিষয়টি তুলে ধরছে।

শুধু এ গ্রামেই নয়, রাজশাহীর প্রতিটি গ্রামে এখন এমন অবস্থা বিরাজ করছে। ফলে খেটে খাওয়া মানুষেরা পড়েছে চরম বিপাকে। সরকারি নির্দেশে ঘরের বাইরে যেতে না পেরে, রাস্তায় নামতে না পেরে শত শত মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে একেকটি গ্রামে। যাদের বেশির ভাগই হতদরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত। কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কর্তাদের কপালেও পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। তাঁরা না পারছেন কারো কাছে হাত পাততে আবার না পাচ্ছেন সরকারি সহযোগিতা। এ পরিবারগুলো প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এত দিন কোনো না কোনো উপায়ে দুমুঠো ভাত জোটাতেন তাঁরা। কিন্তু কয়েক দিন ধরে আয়ের সব পথই বন্ধ হয়ে গেলে তাঁরা সংকটে পড়ে যান।

সরেজমিনে গিয়ে ঘুরে দেখা গেছে, গত ২৬ মার্চ থেকে মূলত কর্মহীন হয়ে পড়ে রাজশাহীর খেটে খাওয়া মানুষগুলো। দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, অটোরিকশাচালক, সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক, বাসচালক থেকে শুরু করে ছোট ছোট পান-সিগারেটের দোকান করে যারা এত দিন সংসার চালিয়ে আসছিল তারাও একই কাতারে। এদের বেশির ভাগেরই বাড়িতে কোনো খাবার মজুদ নেই। দু-চার কেজি চাল-ডাল থাকলেও সেগুলোও হয়তো কারো কারো বাড়িতে এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। আবার কারো শেষের পথে।

পুঠিয়ার ভড়ুয়াপাড়া গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শুনছি সরকার নাকি সহযোগিতা করবে আমাদের। কবে করবে? ঘরের বাইরে যেতে না পারি, কাজ করতে না পারি খাওয়ার অভাবে মরি যাওয়ার পরে করবে? আমরা এখুনি সহযোগিতা চাই। আমার বাড়িতে খাওয়ার জমা নাই যে দিনের পর দিন বসে থ্যাকি খ্যাতে পাব।’

একই গ্রামের হযরত আলী বলেন, ‘ভোটের সময় নেতাদের ভিড় দেখা যায়। এখুন নেতারা কুণ্ঠে আছে? আমাদের এই বিপদে তারা অন্তত দুই মুঠ চাল নিয়ে এসে দেখা করুক। সরকারি চাল তো সব লোকে পাবে না। তাহলে অন্যরা কী খাবে? আর চাল পালেও ভাত খাব কী দিয়ে?’

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী শহরেও প্রায় একই অবস্থা বিরাজ করছে। যদিও প্রায় ২০ হাজার কর্মহীন মানুষকে সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের উদ্যোগে ও মহানগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে চালসহ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে কয়েক লাখ কর্মহীন মানুষ রয়েছে এ শহরে। ফলে এ অনুদান না পাওয়া বেশির ভাগ পরিবারই পড়েছে বিপাকে। তবে জেলার ছয় এমপির ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোথাও এখন পর্যন্ত কোনো খাদ্য সরবরাহের খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি কোনো নেতাকেও মাঠে নামতে দেখা যায়নি। ছোট আকারে ব্যক্তি উদ্যোগে শহরের অনেকেই অসহায় মানুষের পাশে নেমেছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা