kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৬  মে ২০২০। ২ শাওয়াল ১৪৪১

করোনায় কর্মহীনদের দুর্বিষহ জীবন

৩০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনায় কর্মহীনদের দুর্বিষহ জীবন

বগুড়ার ধুনটে কাজ না থাকায় ঘুমিয়ে সময় পার করছেন দর্জি । ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে জনসমাগম ও চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে কর্মজীবী মানুষ। বিশেষ করে কাজ হারিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে দিনমজুর, শ্রমজীবীসহ নিম্ন আয়ের মানুষজন। সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে তারা। সব মিলিয়ে গত কয়েক দিনে তাদের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ

 

বগুড়া

ধুনট ও নন্দীগ্রাম (বগুড়া) প্রতিনিধি

ওয়াদুদ আলী পেশায় দর্জি। প্রতিদিন ফুটপাতে বসেন। তৈরি করেন পোশাক। সেই আয় দিয়ে চলে তাঁর সংসার। কিন্তু করোনার প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তিনি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফুটপাতে বসেও মিলছে না কাজ। গতকাল সকাল ১১টার দিকে বগুড়ার ধুনট প্রেস ক্লাবের সামনে ফুটপাতে সেলাই মেশিনের ওপর মাথা রেখে ওয়াদুদ আলীর অলস সময় পার করার করুণ দৃশ্য চোখে পড়ে।

ওয়াদুদ আলী একা নয়, এ রকম সময় যাচ্ছে উপজেলার হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের। করোনাভাইরাস প্রতিরোধের চেয়ে তাদের কাছে তিন বেলা খাবার খেয়ে জীবন বাঁচানোটাই এখন দায় হয়ে পড়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হলেও গত ২৬ মার্চ থেকে কার্যত ধুনটের পুরো শহর লকডাউন হয়ে আছে। এ সময়ের মধ্যে ফার্মেসি আর নিত্যপণ্যের দোকান ছাড়া সব কিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষকে ঘরে রাখতে চলছে নানা কার্যক্রম। আর এই স্বেচ্ছাবন্দিতে বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষগুলো।

দর্জি শ্রমিক ওয়াদুদ আলী বলেন, ‘রোগের ভয়ের চেয়ে পেটের ক্ষুধার জ্বালা অনেক বেশি। ঘরে বসে থাকলে খাবার দেবে কে? তাই বের হয়েছি। কিন্তু শহরে মানুষ নাই। তাই কাজও পাইতাছি না। পেট চলব কেমনে?’

পান বিক্রেতা আব্দুল জলিল বলেন, ‘প্রতিদিন পান বিক্রি করে যা আয় হতো, তা দিয়ে সংসার চলত। কিন্তু বর্তমানে মানুষের সমাগম বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের নির্দেশে দোকানপাট বন্ধ। এখন আমরা গরিব মানুষ কোথায় যাব? এভাবে কিছুদিন গেলে না খেয়ে মরতে হবে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নগদ টাকা ও ত্রাণ এসে পৌঁছেছে আবার কিছু ত্রাণ আসার পথে রয়েছে। কর্মহীন মানুষের মাঝে এসব ত্রাণ বিতরণ করা হবে।’

এদিকে বগুড়ার নন্দীগ্রামে বাধ্য হয়ে সরকারি বিধি-নিষেধ ভাঙছে নিম্ন আয়ের মানুষরা। সরকারিভাবে চাল দেওয়ার খবর শুনেই শত শত মানুষ ভিড় করছে উপজেলা পরিষদে। বিশ্বজুড়ে হানা দেওয়া করোনাভাইরাস নিয়ে মানুষের মাঝে বেশ আতঙ্ক বিরাজ করছে। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার, ঘরের মধ্যে অবস্থানের মতো কড়াকড়ি নির্দেশনা মানার পরামর্শ দিচ্ছে প্রশাসন। কিন্তু টাকার অভাব ও পেটের দায়ে গ্রামের বেশির ভাগ নিম্ন আয়ের মানুষ তা মানতে পারছে না।

প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, নন্দীগ্রাম উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়নে ১০ টন চাল ও ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় পাঁচ টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। বরাদ্দ অনুযায়ী উপজেলা ও পৌরসভায় এক হাজার ৫০০ জন কর্মহীন পরিবার ১০ কেজি করে চাল পাবে। এমন খবর পেয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার শর্ত ভেঙে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের শত শত কর্মহীন ভ্যান-রিকশাচালকসহ নিম্ন আয়ের মানুষরা উপজেলা পরিষদে ভিড় জমায় গতকাল।

ভ্যানচালক আবুল কালাম বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে রিকশা-ভ্যান বন্ধ থাকায় পরিবার নিয়ে কষ্টে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। সরকারিভাবে চাল দেওয়ার খবর পেয়ে উপজেলা পরিষদে এসেছি। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না। তাহলে খাবার পাব কোথায়?’ জানতে চাইলে নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আখতার জানান, সরকারিভাবে বিনা মূল্যে চাল দেওয়ার খবর শুনে তাঁরা এসেছেন। তা ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বজায় রেখে চেয়ারম্যানদের চাল দিতে বলা হয়েছে।

 

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার তিস্তা নদীতে মাছ ধরা বন্ধ হওয়ায় ঘাটে বাঁধা জেলে নৌকা।        ছবি : কালের কণ্ঠ

রংপুর

পীরগাছা (রংপুর) প্রতিনিধি 

প্রমত্তা তিস্তা এখন মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। দুই মাস ধরে নদীতে মাছ ধরা পড়ছে না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এখন দল বেঁধে মাছ ধরাও বন্ধ হয়ে গেছে। তাই তিস্তায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলে পরিবারগুলো চরম বিপাকে পড়েছে। শুধু তিস্তা নয়, এ নদীনির্ভর রংপুরের পীরগাছার বুড়াইল, মাষাণকুড়া, আলাইকমারী ও ঘাঘট নদের ওপর নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলোর একই অবস্থা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাতে কাজ না থাকায় উপজেলার প্রায় চার হাজার জেলে পরিবারের অবস্থা করুণ। তারা দিন আনে, দিন খায়। তাদের কোনো পুঁজি নেই। প্রতিটি পরিবারে সদস্যসংখ্যাও তুলনামূলক বেশি। বেশির ভাগ জেলে পরিবারে অভাব লেগেই থাকে। ফলে কাজে যেতে না পারায় জেলে পরিবারগুলো চরম বিপাকে পড়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে জেলেরা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও শুষ্ক মৌসুমে চরম বিপাকে পড়ে। বছরের ছয় মাস মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালায় তারা। বাকি ছয় মাস ধারদেনা করে চলতে হয়। এতে পরিবারের ভরণ-পোষণের ব্যয়ভার নিতে অনেক জেলেকেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। দেনার দায়ে অনেকে এলাকাছাড়া।

দুই মাস ধরে নদ-নদী, খাল ও পুকুর পানিশূন্য হয়ে পড়ায় মাছ শিকার করতে পারছে না জেলেরা। সংসার চালাতে তারা পেশা বদলে কৃষিসহ বিকল্প কাজে জড়িয়ে পড়েছে। অনেকে রিকশা-ভ্যান চালাত। কিন্তু সে কাজও বন্ধ হয়ে গেছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ঘরে থাকতে হচ্ছে জেলে পরিবারগুলোকে।

কান্দি ইউনিয়নের মাঝিপাড়ার হরিপদ চন্দ্র বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে মাছ ধরি, অন্য সময় দিনমজুরি করি। এখন সব কিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘরে বসে আছি। চরম আর্থিক সংকটে পড়েছি।’

তাম্বুলপুর ইউনিয়নের ঘগোয়া গ্রামের সুভাষ চন্দ্র বলেন, ‘তিস্তাসহ তাম্বুলপুর ছাড়ায় পর্যাপ্ত পানি নেই। অন্য কোনো কাজ পারি না। বেকার বসে আছি। ধারদেনা করে সংসার চলছে।’

এ ব্যাপারে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বলেন, ‘নদী, খাল-বিলে এখন তেমন পানি নেই। তাই বেশ কিছু দিন থেকে মাছও ধরা পড়ছে না। তাই বেশির ভাগ জেলে বেকার আছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা