kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

গুদামের ভেতর-বাইরে ধানচক্র

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গুদামের ভেতর-বাইরে ধানচক্র

স্ত্রী কর্তা, স্বামী দালাল

সাইফুল ইসলাম, বাবুগঞ্জ (বরিশাল)

বিরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) ফরিদা ইয়াসমিন। তিনি ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ভোলা সদর থেকে পদায়ন পেয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলায় যোগদান করেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, স্বামী কবির উদ্দিনকে দিয়ে খাদ্যগুদামে তিনি দালালের একটি চক্র গড়ে তুলেছেন। যারা ধান সংগ্রহ অভিযান নিয়ন্ত্রণ করছে।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এক হাজার ৪০ টাকা মণ দরে এক হাজার ৪২৩ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ধান কেনা আজ শুক্রবার পর্যন্ত চলার কথা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকৃত কৃষকদের দফায় দফায় হয়রানি করে যৎসামান্য ধান কেনা হয়েছে। ২০ জানুয়ারি থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে রাতে ৮৩১ টন নিম্নমানের ধান কিনে গুদামজাত করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল, উপজেলা প্রশাসন খাদ্যগুদামে প্রভাবশালী চক্রের পাশ কাটিয়ে সরাসরি যাতে তালিকাভুক্ত প্রকৃত কৃষক ধান বিক্রি করতে পারেন সে বিষয়ে তৎপর থাকবে। কিন্তু উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রুবিনা পারভীন, ওসি ফরিদা ইয়াসমিনের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা চক্র সরব থাকায় সব উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

কৃষকদের অভিযোগ, দুই ধাপে কৃষি দপ্তর এক হাজার ৪১৬টি কার্ডধারী কৃষকের একটি তালিকা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রুবিনা পারভীনের কাছে দেন। গুদামচক্র বাড়ি বাড়ি গিয়ে সামান্য অর্থের বিনিময়ে কৃষকদের র্কাড নিয়ে আসে। কার্ড প্রদানকারী কৃষকদের সান্ত্বনাস্বরূপ দিচ্ছে মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।

সরেজমিনে কৃষি কার্ডধারী জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের নাছিমা বেগম, ইউনুস হাওলাদার আকবর খান, মহিবুল ইসলাম, আক্তার হোসেনসহ ২৩ জন কৃষকের কার্ড নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দেহেরগতি ইউনিয়নের রাকুদিয়া গ্রামের ঝর্ণা বেগম, রিনা বেগম এবং কেদারপুর ইউনিয়নের দক্ষিণভূতেরদিয়া গ্রামের মো. খোকন, মো. সাইফুল ইসলাম জানান, বাবুগঞ্জ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন থেকে কৃষি দপ্তর থেকে কার্ড লটারির মাধ্যমে বাছাই করা হয়। কার্ডধারী কৃষকদের ফসলি জমিতে তিন টন ধান কখনো উৎপাদন হয়নি। আবার কৃষি কাডধারী বেশির  ভাগ ব্যবসায়ী, খাদ্যগুদামের সরদার।

স্থানীয় কৃষকরা আরো জানান, ধান বিক্রির জন্য নমুনা নিয়ে ফরিদা বেগমের কাছে মান ও আর্দ্রতা পরীক্ষা করাতে গেলে ভালো নয়, এমন অজুহাত দেখান। প্রকৃত কৃষকদের বারবার ফিরিয়ে দিয়ে হয়রানি করতে থাকেন। অথচ ওই ধানই চক্রের মাধ্যমে ঘুষের বিনিময়ে গুদামে সরবরাহ করেন গুদাম কর্মকর্তার স্বামী কবির উদ্দিন ও স্থানীয় প্রভাবশালী দালাল-ফড়িয়ারা।

এ বিষয়ে খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা ফরিদা ইয়াসমিন তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে সরবরাহ করা তালিকা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। গুদামে কোনো চক্র নেই। তাঁর স্বামী কোনো ধান এ গুদামে সরবরাহ করেননি। তিনি একজন ঠিকাদার।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোসা. রুবিনা পারভীন বলেন, ‘কে কৃষক, কে ব্যবসায়ী এটি আমার জানার বিষয় নয়। কৃষি তালিকা অনুযায়ী ধান কেনা হয়েছে।’ প্রকৃত কৃষকদের ধান ফেরত দিয়ে রাতের আঁধারে চক্রের মাধ্যমে ধান কেনার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘বন্ধের দিন এবং রাতেও ধান কেনার বিধান রয়েছে।’

ইউএনও নুসরাত জাহান খান জানান, খাদ্য বিভাগের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে।

 

কৃষকরা বঞ্চিত

কাজল কায়েস, লক্ষ্মীপুর

সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা খাদ্যগুদাম ধানে ভরপুর করার অভিযোগ উঠেছে। প্রতি মণ ধানে অফিস খরচের নামে ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে আদায় করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের হটলাইনে অভিযোগ করে প্রতিকার চেয়েছেন সচেতন কয়েকজন কৃষক।

উপজেলা খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, কমলনগরে দুই হাজার ৫১ টন ধান বরাদ্দ হয়। প্রতি মণ ধান এক হাজার ৪০ টাকা ধরে কেনার সিদ্ধান্ত হয়। কৃষি কার্ডধারী প্রত্যেক কৃষক এক থেকে তিন টন পর্যন্ত ধান সরবরাহ করতে পারবেন। আজ শুক্রবার ধান কেনার শেষ সময়। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, গুদাম কর্মকর্তা, সহকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ মতলববাজ ধান সিন্ডিকেট প্রথমে লটারি করে কৃষকের তালিকা নির্ধারণ করে এক টন করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শেষের দিকে এসে তিন টন করে নেয়। এতে কৃষকরা ধোঁয়াশার মধ্যে পড়েন।

উপজেলার তোরাবগঞ্জ, চর ফলকন ও হাজিরহাট এলাকার কৃষি কার্ডধারী সাতজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। তাঁরা জানান, সরকারের ঘোষণা শুনে প্রান্তিক চাষিরা গুদামে শুকনো ধান নিয়ে যান। সেখান থেকে কাঁচাসহ নানা অজুহাত দেখিয়ে ধান ফেরত দেওয়া হয়েছে। এতে পরিবহন খরচের কারণে তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। অথচ সিন্ডিকেটের লোকজন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে গুদামে ধান সরবরাহ করছেন। সাধারণ কৃষকের কাছ থেকে কিছু ধান নেওয়া হলেও তা শুধু লোক দেখানো। তাঁদের কাছ থেকে মণপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে ব্যাংক বিল হওয়ার পর হাতিয়ে নেওয়া হয়। সিন্ডিকেটের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন, গুদাম, ব্যাংক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুইজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, কৃষকের স্বার্থে সরকার মহতী উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এর প্রচারণা নেই। ধান সিন্ডিকেটের দাপটে তা ভেস্তে গেছে। তৃণমূলের কৃষক ধান গুদামে নিলে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাঁরা বাধ্য হয়ে বাড়িতে ধান নিয়ে যেতে হন।

উপজেলা খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) তারেকুল আলম বলেন, ‘আমি কোনো অনিয়ম করিনি। গুদামে কৃষকরাই ধান দিয়েছেন। বরাদ্দ হওয়া ধান এরই মধ্যে সংগ্রহ হয়ে গেছে।’ তবে বরাদ্দে কত টন এখনো বাকি আছে তা নির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেননি তিনি।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম নুরুল আমিন বলেন, ‘আমি ধান সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত নই। খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা সবাইকে ম্যানেজ করে চলেন। আমরা কমলনগরে আরো ধান বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, ‘এখানে আমি নতুন যোগদান করেছি। কৃষকরা সরাসরি অভিযোগ করলে পরিচয় গোপন রাখা হবে। খাদ্য কর্মকর্তা ও গুদাম কর্মকর্তাকে ডেকে সতর্ক করে দেওয়া হবে।’

জানতে চাইলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) শাহেদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কমলনগরে অনিয়মের বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) অঞ্জন চন্দ্র পাল বলেন, ‘ধান সংগ্রহে অনিয়মের বিষয়টি কেউ আগে আমাকে জানায়নি। এখন অ্যাকশনে যাওয়া হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা