kalerkantho

শুক্রবার । ২০ চৈত্র ১৪২৬। ৩ এপ্রিল ২০২০। ৮ শাবান ১৪৪১

বিল কেটে পুকুর

রফিকুল ইসলাম, গোলাম রসুল ও টিপু সুলতান, রাজশাহী   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিল কেটে পুকুর

রাজশাহীর তানোর উপজেলার শিবনদীর বাঁধের পূর্ব ধারে মোহনপুর এলাকায় আইন ও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শত শত বিঘা আবাদি জমি কেটে চলছে পুকুর খনন। ছবিটি গত বৃহস্পতিবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজশাহীর মোহনপুর ও তানোর উপজেলার মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে শিব নদ। এ নদের পাশে বিলমাই। এ বিলে প্রায় ৩০০ বিঘা ফসলি জমি কেটে পুকুর করা হচ্ছে। অন্যদিকে দুর্গাপুরের আংরার বিলে প্রায় ২০০ বিঘা ফসলি জমি কেটে পুকুর করা হচ্ছে।

প্রতিবছর বিল দুটিতে সবুজ ধানে ভরে থাকে মাঠ। কিন্তু এবার সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে পুকুর। বিলমাইয়ে এরই মধ্যে একটি বিশালাকারের পুকুর কাটার কাজ চলছে। আরেকটিও কাটা হবে দ্রুত। এই পুকুর কাটছেন ঘাষিগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম বাবলু ও নিরঞ্জন নামের এক ব্যক্তি। বাবলু রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আয়েন উদ্দিনের বড় ভাই।

অন্যদিকে দুর্গাপুরে আংরার বিলে পুকুর কাটছেন আব্দুর রহিম ও বাবুল হোসেন। অথচ গত ৪ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে এ উপজেলায় পুকুর কাটা নিষিদ্ধ করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না।

অভিযোগ উঠেছে, পুকুর খননে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভূমি অফিসের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে। ফলে কোনো বাধা ছাড়াই রাত-দিন সমানে চলছে পুকুর খনন। এমনকি দুর্গাপুরের বিল বাঁচাতে স্থানীয়রা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ায় উল্টো তাদের নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে প্রভাবশালীরা। এ নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছে প্রতিবাদকারীরা।

সম্প্রতি তানোরের বিলমাইয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১৫০ বিঘা জমি কেটে একটি পুকুর কাটার কাজ চলছে। বিলের মাটি কাটার জন্য তিনটি ড্রেজার নামানো হয়েছে। সেই মাটি নিয়ে করা হচ্ছে পার। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শিব নদের বাঁধের পাশ দিয়ে এ পুকুর কাটা হচ্ছে প্রায় ১৫ দিন ধরে। এভাবে চলতে থাকলে আর কয়েক দিনের মধ্যে কাটা শেষ হবে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে, বিলটি মোহনপুরের মধ্যে পড়েছে। এ কারণে আজহারুল ইসলাম বাবলু বিলের জমি কৃষকদের কাছ থেকে লিজ নিয়ে চলছে পুকুর খনন। ফলে এবার ধান চাষও হয়নি। এতে এবার ধান চাষ কমে যাবে এ উপজেলায়।

জানতে চাইলে আজহারুল ইসলাম বাবলু বলেন, ‘এ বিলে কোনো ফসল হয় না বলে জমি লিজ নিয়ে পুকুর কাটা হচ্ছে। পুকুর কাটার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নেওয়া হয়েছে। আমরা কোনো অবৈধ কাজ করছি না।’

তবে রাজশাহীতে পুকুর কাটা অবৈধ বলে উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা রয়েছে। এ নির্দেশনার বলে জেলাজুড়ে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালালেও মোহনপুরে তা দেখা যায়নি। ফলে নির্বিচারে এ বছরও চলছে পুকুর খনন।

জানতে চাইলে মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘এই পুকুর খননের কাজটি একবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর পরও যদি চলে তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেব। কাউকে পুকুর খনন করতে দেওয়া হবে না।’

এমপি আয়েন উদ্দিনের ফোনে কল করলে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ইকবাল হোসেন বলেন, ‘স্যার ব্যস্ত আছেন, পরে কথা বলবেন।’ পরে কল করলেও একই কথা শোনানো হয়।

এদিকে দুর্গাপুরে অন্য সব পুকুর খনন বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। কিন্তু আংরার বিলে পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিলের চারদিকে চলছে পুকুরের পার নির্মাণের কাজ। ধানের জমি কেটে চারটি বিশালাকার ড্রেজারের মাধ্যমে খনন চলছে। কিন্তু এলাকাবাসী ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।

স্থানীয়রা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ বিলটি রক্ষার জন্য পরিবেশ আন্দোলনের একজন ব্যারিস্টারকে দিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করে পুকুর কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের নির্দেশনা পায় এলাকাবাসী। কিন্তু যাঁরা এ নির্দেশনার পেছনে কাজ করেছেন এখন পুকুর মালিকরা উল্টো তাঁদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।

জানতে চাইলে অভিযুক্ত আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমাদের সব কাগজ সঠিক আছে। তাই পুকুর খনন করছি। এমপিও আমাদের সহযোগিতা করেছেন। কারণ ওই জমিতে কোনো ফসল হয় না। বছরে একবার শুধু ধান হয় কিছু কিছু জমিতে।’

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহসীন মৃধা বলেন, ‘তাঁরা আদালত থেকে একটি নির্দেশনা নিয়ে পুকুর খনন শুরু করেন। পরে ওই নির্দেশনাও বাতিল করা হয়েছে বলে শুনেছি; কিন্তু কোনো কাগজ পাইনি। তাই পুকুর খনন চলছে।’

তবে এমপি মুনসুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের পুকুর খননের বিষয় আমার জানা নেই। পুকুর খনন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা আছে। এটি উপজেলা প্রশাসন দেখবে।’

উল্লেখ্য, পরিবেশ আন্দোলনের একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি রাজশাহীতে ফসলি জমি নষ্ট করে পুকুর খনন বন্ধের নির্দেশনা দেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা