kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ চৈত্র ১৪২৬। ৩১ মার্চ ২০২০। ৫ শাবান ১৪৪১

বিহঙ্গ দ্বীপের বন উজাড়

পাথরঘাটায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মারা যাচ্ছে কেওড়াগাছ

দেবদাস মজুমদার, পিরোজপুর ও মির্জা খালেদ, পাথরঘাটা   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিহঙ্গ দ্বীপের বন উজাড়

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বিহঙ্গ দ্বীপে হাজার হাজার কেওড়াগাছ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সুন্দরবন বিধৌত বলেশ্বর নদ ও সাগর মোহনার সংযোগস্থলে বিহঙ্গ দ্বীপের বনাঞ্চলে কেওড়াগাছ (বনজ গাছ) প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে। এখানে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠা কয়েক হাজার কেওড়াগাছ মারা গেছে। সেই সঙ্গে বিহঙ্গ দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমাংশে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেওয়ায় বিশাল অংশজুড়ে বনভূমি উজাড় হতে চলেছে।

গত শনিবার বিকেলে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বলেশ্বর নদ ও সাগর মোহনার বিহঙ্গ দ্বীপে গিয়ে কেওড়াগাছের বিপন্ন সারি দেখা গেছে। দ্বীপটির উত্তর-পশ্চিমাংশে কয়েক হাজার কেওড়াগাছ শুকিয়ে মারা গেছে। স্থানীয় জেলেরা দাবি করছে, বিগত ঘূর্ণিঝড়ে বিহঙ্গ দ্বীপের বনাঞ্চলের কেওড়াগাছের ডালপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ধীরে ধীরে সেখানকার কয়েক হাজার কেওড়াগাছ শুকিয়ে মারা যায়। সেখানে নতুন করে কোনো বৃক্ষ রোপণ না করায় অনেকটা এটি বিরান দ্বীপে পরিণত হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রবহমান বলেশ্বর নদ মিলেছে সাগর মোহনায়। সাগর ও নদের মোহনার সংযোগস্থলে নয়নাভিরাম জলরাশির খেলা। উপকূলীয় অঞ্চল বরগুনার পাথরঘাটার পদ্মা স্লুইস গেটের খালের মোহনায় এসে দাঁড়ালে বিহঙ্গ দ্বীপের সবুজ বনভূমির মায়ামুগ্ধ আবহ হাতছানি দিয়ে ডাকে। কয়েক বছর আগে জেগে ওঠা বিহঙ্গ দ্বীপ পরিযায়ী পাখিদের অভয়াশ্রম ছিল। জেলেরা বিশ্রামের জায়গা হিসেবে এখানে অবস্থান নিত। শীত এলেই অপূর্ব নৈসর্গিক আর নয়নাভিরাম দ্বীপটিতে দর্শনার্থীরা ভিড় করে।

গত মঙ্গলবার ভরদুপুরে চরটিতে গিয়ে দেখা গেছে, চরটির একদিকে সাদা বালু, আরেক দিকে লাল বালুর মিশেল। আর প্রাকৃতিকভাবে চরজুড়ে নানা বৃক্ষরাজির সমারোহ। চরের তীরে সাগরের ফেনিল জলরাশি আছড়ে পড়ছে। দ্বীপের বনাঞ্চলে বর্ণিল পাখিদের বিচরণ। সেই সঙ্গে সম্প্রতি সেখানে বন বিভাগের সৃজিত বনায়ন নতুন শোভাবর্ধন করেছে। চরের চারপাশে সারি সারি জেলে নৌকার বিচরণ। বন বিভাগ এ চরের বনাঞ্চলে হরিণ আর বিপন্নপ্রায় কিছু পশু-পাখি অবমুক্ত করে। কিন্তু সম্প্রতি বিহঙ্গ দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমাংশে কেওড়া বন শুকিয়ে মরে যাওয়ায় দ্বীপটির সৌন্দর্য ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পাথরঘাটার বলেশ্বর নদের পদ্মা স্লুইস মোহনা থেকে দুই কিলোমিটার নদ ও সাগর মোহনা বক্ষে প্রাকৃতিকভাবে জেগে উঠেছে চর। ১০০ একর চরের বিশাল অংশজুড়ে পাশের সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা ছৈইলা, গেওয়াসহ নানা জাতের উদ্ভিদও বেড়ে ওঠে। পরে বন বিভাগ প্রাকৃতিকভাবে সৃজিত এ দ্বীপে অভয়ারণ্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। মনোরম ও নান্দনিক শোভা নিয়ে দ্বীপটি দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে চলেছে।

স্থানীয় জেলে ও সুন্দরবনের স্বেচ্ছাসেবী দল টাইগার টিমের দুলাল মিয়া বলেন, ‘প্রায় ১৫ বছর আগে বলেশ্বর নদী ও সাগর মোহনার সংযোগস্থলে আমরা ডুবোচরের দেখা পাই। এরপর ধীরে ধীরে চরের পরিধি দৃশ্যমান হয়। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে ও সাইনবোর্ড স্থাপন করে বলেশ্বর নদী ও সাগর মোহনার মধ্যবর্তী স্থানে জেগে উঠা নতুন দ্বীপটির নামকরণ করা হয় বিহঙ্গ দ্বীপ।’

এ বিষয়ে পাথরঘাটা উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কবির বলেন, ‘পাথরঘাটা শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে বলেশ্বর নদীর পদ্মা স্লুইস গেট থেকে সাগর ও বলেশ্বর মোহনার সংযোগস্থলে জেগে উঠা চর বিহঙ্গ দ্বীপ এখন নতুন এক সম্ভাবনা। চরটি দর্শন করতে প্রতিদিন এলাকার উত্সুক জনতা সেখানে যাচ্ছে। আমরা একে বিহঙ্গ দ্বীপ নামে পরিচিত করার জন্য জনসংযোগ চালাচ্ছি। আমরা আশাবাদী, পর্যটন এলাকা হিসেবে বিহঙ্গ দ্বীপটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আরো সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে।’

পাথরঘাটা বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মুনিরুজ্জামান বলেন, ‘ইতিমধ্যেই দ্বীপটি পর্যটকদের আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে বনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে কেওড়াগাছ কেন মারা যাচ্ছে—এর কারণ জানা যায়নি। তবে সেখানে বরগুনার জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তার পরামর্শে সাড়ে সাত হাজার ঝাউগাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বিহঙ্গ দ্বীপের উন্নয়নের জন্য জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহর যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। তাঁর উদ্যোগে বন বিভাগের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা