kalerkantho

রবিবার। ১৬ কার্তিক ১৪২৭ । ১ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

গাইবান্ধায় খাবার পানি সরবরাহ প্রকল্প

পরিকল্পনায় গলদ

এক যুগ আগে ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়

অমিতাভ দাশ হিমুন, গাইবান্ধা   

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পরিকল্পনায় গলদ

গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের দক্ষিণ গিদারী গ্রামে স্থাপিত বরেন্দ্র প্রকল্পের সেচ পাম্পের পাশে খাবার পানি সরবরাহে নির্মিত ট্যাংক। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাইবান্ধায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অপরিকল্পিতভাবে খাবার পানি সরবরাহ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ায় তা এখন ভণ্ডুল হতে বসেছে। সম্ভাব্যতা ও  পরিস্থিতি যাচাই না করার ফলে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তাদের সেচ এলাকায় সুবিধাভোগীদের মধ্যে খাবার পানি সরবরাহের লক্ষ্যে একটি বিশেষ কর্মসূচি নেয়। এর আওতায় গাইবান্ধার পাঁচটি উপজেলায় ১৪টি পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এক কোটি ৬৪ লাখ ৬১ হাজার ২৫৬ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ জন্য সেচ পাম্পসংলগ্ন স্থানে একটি ট্যাংক এবং ছয় থেকে আট হাজার ফুট পাইপ বসানো হয়। ট্যাংকের পানি ধারণক্ষমতা ২৫ হাজার লিটার। এর মধ্যে গাইবান্ধা সদর উপজেলার বৌলেরপাড়া, বাড়ইপাড়া, আনালেরতাড়ি, পূর্ব বারবলদিয়া, দক্ষিণ গিদারী ও খামার বোয়ালী; সাদুল্যাপুরের ইসবপুর ও গয়েশপুর; সুন্দরগঞ্জের চণ্ডীপুর ও ছাপরহাটি; গোবিন্দগঞ্জের কাঁঠালবাড়ী, বাতাইল, ছোট সাতাইল ও খুরশাইল এবং পলাশবাড়ী উপজেলার পশ্চিম দুবলাগাড়ীতে এই ১৪টি প্রকল্প স্থাপন করা হয়। প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ১১ লাখ ৭৫ হাজার ৮০৪ টাকা ব্যয় করা হয়। এসব প্রকল্পের সাহায্যে মোট এক হাজার ৫৯০টি পরিবারে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

কিন্তু এ প্রকল্পের সঙ্গে শোধনাগার সংযুক্ত না করায় ১০টি পানি সরবরাহ প্রকল্প এক জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়ে। এসব এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রন ও আর্সেনিকের আধিক্য থাকায় স্থানীয় লোকজন খাবার এবং ব্যবহারের পানি হিসেবে তা গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়নি। ফলে ওই তিন উপজেলায় পানি সরবরাহ প্রকল্প চালু হতে না হতেই এর কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, গাইবান্ধার পশ্চিমাংশ তথা গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ী উপজেলার আটটি ইউনিয়ন মূলত বরেন্দ্র এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে রয়েছে গোবিন্দগঞ্জের কামদিয়া, রাজাহার, শাখাহার, সাপমারা, কাটাবাড়ী ও গুমানিগঞ্জ এবং পলাশবাড়ীর হোসেনপুর ও কিশোরগাড়ী ইউনিয়ন। শুরুতে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বরেন্দ্র এলাকায় সেচ সরবরাহের মধ্য দিয়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। পরে তারা বরেন্দ্রবহির্ভূত এলাকায় তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। তারা সেচ সরবরাহ ছাড়াও অন্যান্য কর্মসূচি নেয়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে খাবার পানি সরবরাহ, খাল-বিল ও পুকুর খনন, বৃক্ষ রোপণ, ফলদ বৃক্ষের চারা বিতরণ, কৃষক ও মৎস্য চাষি প্রশিক্ষণ।

সূত্রটি আরো জানায়, বরেন্দ্র এলাকায় পানি মোটামুটি আয়রনমুক্ত। কিন্তু বরেন্দ্রবহির্ভূত এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রন ও আর্সেনিকের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। ফলে গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ী উপজেলায় পানি সরবরাহ কার্যক্রম সফল হয়েছে। ওই দুটি উপজেলায় স্থাপিত চারটি প্রকল্প এখনো চালু রয়েছে। সেখানে দুই হাজার ৩০০ পরিবার খাবার পানি সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু বরেন্দ্রবহির্ভূত সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্যাপুর ও সদর উপজেলায় ১০টি প্রকল্প চালু করা সম্ভব হয়নি।

সদর উপজেলার দক্ষিণ গিদারী প্রকল্প এলাকার কৃষক অনিছুর রহমান বলেন, তাঁদের বাড়ির নলকূপে প্রচুর আয়রন। নলকূপের পানিতে কাপড় কাচলে তা লাল হয়ে যায়। বরেন্দ্র প্রকল্প ভালো পানি দেবে আশা থাকলেও তাদের সরবরাহের পানিতে প্রচুর আয়রন। তাই স্থানীয় মানুষ ওই পানি ব্যবহার করতে রাজি হয়নি।

সমাজসেবী নূরুল আলম বলেন, ‘উদ্যোগটি ভালো হলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বিপুল অর্থের অপচয় হচ্ছে। নতুন করে পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থাসহ এটি এ অঞ্চলে পুনরায় চালু করা গেলে তা সব দিক থেকে সাশ্রয়ী হবে।’

সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানায়, এ ধরনের একটি ছোট পানি পরিশোধনাগার স্থাপনে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন। এই মুহূর্তে ওই পরিমাণ টাকা বরাদ্দ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’ বিকল্প হিসেবে তিনি জানান, এ এলাকার ভূগর্ভের ২০ ফুট পর্যন্ত নিচ স্তরে পানি মোটামুটি স্বচ্ছ। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানে এই স্তরে শ্যালো মেশিন বসিয়ে বিকল্প পন্থায় ওভারহেড ট্যাংকে পানি তুলে তা পাইপলাইনের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের মধ্যে সরবরাহ করা যেতে পারে। এ ধরনের একটি শ্যালো মেশিন স্থাপনে মোটর পাম্প এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মিলে প্রয়োজন হবে ৫০ হাজার টাকা।

মন্তব্য