kalerkantho

রবিবার। ১৬ কার্তিক ১৪২৭ । ১ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

তিস্তার গতিপথ বদল

মাঝ নদীতে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর, বন্যার ঝুঁকিতে পীরগাছার ৩৯টি গ্রাম

রবিউল আলম বিপ্লব, পীরগাছা (রংপুর)   

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তিস্তার গতিপথ বদল

রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় তিস্তার মাঝ নদীতে জেগে উঠেছে চর। ছবি : কালের কণ্ঠ

বদলে যাচ্ছে প্রমত্তা তিস্তা নদীর গতিপথ। দুই বছর ধরে গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ডান তীর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এতে তিস্তা নদীর তীরবর্তী রংপুরের পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর ও ছাওলা ইউনিয়নের ১০টি গ্রামসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ডান তীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে রয়েছে।

গত বন্যায় প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে বাঁধের মাত্র ৩০০ মিটারের মধ্যে ভাঙন চলে এসেছে। বর্ষা শুরুর আগেই দ্রুত বাঁধ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ৩৯টি গ্রাম বন্যাকবলিতসহ ভাঙনঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে জানা যায়, ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার পর থেকে ভাঙনের কবলে পড়ে তিস্তার ডান ও বাঁ তীর। মাঝ নদীতে জেগে উঠতে থাকে অসংখ্য চর। ফলে ক্রমেই নদীর প্রবাহ দুই তীর ঘেঁষে সরে যেতে শুরু করে।

পীরগাছা উপজেলার গাবুড়ার চর এলাকা থেকে তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তন শুরু হয়। দুই বছর আগে গাবুড়ার চরসহ পাঁচটি গ্রাম ভাঙনের কবলে পড়ে। সেই ভাঙনের মধ্য দিয়েই ডান দিকে স্রোত বইতে শুরু করে। এরপর ছাওলা ইউনিয়নের পানিয়ালের ঘাট থেকে নতুন গতিপথ সৃষ্টি হয়। পানিয়ালের ঘাট থেকে শিবদেব চর পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার এলাকায় তিস্তার ডান তীরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়ে। তিস্তার গতিপথ পরিবর্তনের কারণে বর্ষায় নদীর স্রোত ডান তীর ঘেঁষে প্রবাহিত হয়।

ফলে উপজেলার ছাওলা ও তাম্বুলপুর ইউনিয়নের তিস্তা নদীর তীরবর্তী গাবুড়ার চর, শিবদেব চর, কিশামত ছাওলা, পূর্ব হাগুরিয়া হাশিম, চরছাওলা, চরকাশিম, শিবদেব চর, চরতাম্বুলপুর ও চররহমত গ্রামের প্রায় ২০ হাজার পরিবার ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি তিস্তাসংলগ্ন হওয়ায় এলাকাবাসীর কাছে এটি তিস্তার ডান তীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, কাউনিয়া থেকে পীরগাছা উপজেলার ভেতর দিয়ে সুন্দরগঞ্জ পর্যন্ত নির্মিত বাঁধটি তিস্তাসংলগ্ন হলেও এটি ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ।

এলাকাবাসী জানায়, বাঁধটি প্রথম থেকেই ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙন কাছাকাছি চলে আসায় ভয়ে রয়েছে তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ড এর আগে তিস্তা নদীর ভাঙন রোধে উপজেলার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের সাহেব বাজার থেকে লাটশালা ও খোর্দ্দার চর পর্যন্ত একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করে। পরে পাশের গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের লাটশালা ও খোর্দ্দার চরে ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালে পাউবো আগের অধিগ্রহণ করা জমি বেক্সিমকো পাওয়ার কম্পানিকে সড়ক নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য বেক্সিমকো পাওয়ার কম্পানি নতুন তিন কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও আগের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের আট কিলোমিটার অংশ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পাউবোর কর্মকর্তাদের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও নজরদারির অভাবে মাটি দিয়ে সংস্কার ও বর্ধিত সড়ক নির্মাণ না করে গোড়া থেকে শ্যালো মেশিন দিয়ে ভূগর্ভস্থ বালু তুলে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়।

এতে বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসেও বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ফলে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীনসহ বিপর্যয়ের শঙ্কা করছে এলাকাবাসী। এ ছাড়া ছাওলা, তাম্বুলপুর ও কান্দি ইউনিয়নের ৩৯টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়বে।

চরছাওলা গ্রামের আফছার আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পাউবোর ভুলের কারণে বারবার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। পাউবো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের সময় যদি উজানে একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করত তাহলে লোকালয়ে নদীর পানি ঢুকতে পারত না।’

তাম্বুলপুর এলাকার ফজলুর রহমান বলেন, ‘পানিয়ালের ঘাট থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভাটিতে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ এলাকায় বাঁধ দিয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে বালু ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে তিস্তার স্রোত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে গতিপথ পরিবর্তন হয়ে বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত ডান তীর ঘেঁষে প্রবাহিত হওয়ায় ভাঙন বৃদ্ধি পেয়েছে।’

তাম্বুলপুর ইউপি চেয়ারম্যান রওশন জমির রবু বলেন, ‘প্রতিবছর বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে চরাঞ্চলের সব কটি গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়। দেখা দেয় নদীভাঙন। বন্যা ও নদীভাঙন রোধে উজানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব।’

পীরগাছা উপজেলা প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলার ছাওলা ও তাম্বুলপুর ইউনিয়নে তিস্তার ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করেছে। বন্যা ও ভাঙন রোধে তিস্তার ওই এলাকায় আরো বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন।’

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী কৃষ্ণকমল সরকার বলেন, ‘বরাদ্দ না পাওয়ায় তিস্তার ওই এলাকায় গত ৪০ বছরেও উজানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ভাঙন রোধে উজানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। বরাদ্দ পেলে ভাঙন রোধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

মন্তব্য