kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ভাটায় পোড়ে শিশুর ভবিষ্যৎ

ঠাকুরগাঁওয়ে প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে শতাধিক ইটভাটা

পার্থ সারথী দাস, ঠাকুরগাঁও   

২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাটায় পোড়ে শিশুর ভবিষ্যৎ

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার এমএ ব্রিকস ভাটায় কাজ করছে শিশুরা। শ্রম আইন অনুযায়ী ১১ বছরের এই শিশুদের দিয়ে কাজ করানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঠাকুরগাঁওয়ে সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে লোকালয় ও কৃষিজমিতে গড়ে উঠছে শতাধিক অবৈধ ইটভাটা। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় এসব ভাটায় ইট তৈরি ও টানার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুদের, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। এতে তাদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি ভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় অনুর্বর হয়ে পড়ছে কৃষিজমি। দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না স্থানীয়রা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সদর উপজেলার প্রায় কম-বেশি সব ইটভাটাতেই শ্রমিক হিসেবে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব শিশুর বাড়ি ভাটাগুলোর আশপাশের গ্রামেই। এদের মধ্যে কেউ কেউ ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজের জন্য ভাটায় চলে আসে। আবার কেউ স্কুল ফাঁকি দিয়ে কাজ করছে ভাটাগুলোতে। কাজ চলে টানা বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এসব শিশু মূলত কাঁচা ইট তৈরি ও ইট বহনের কাজ করে। এক হাজার ইট তৈরি করলে তাদের দেওয়া হয় ৩০০ টাকা। আর এক হাজার ইট টানলে দেওয়া হয় ১০০ টাকা।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার এম এ ব্রিকস ভাটার শিশুশ্রমিক রবিউল ইসলাম (১১)। সকাল ৯টায় কজে এসে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ইট তৈরি করে সে। এর বিনিময়ে পায় ৩০০ টাকা। রবিউল জানায়, তার সমবয়সী আরো অনেকে স্কুল ফাঁকি দিয়ে ইটভাটায় নিয়মিত কাজ করে।

সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের কৃষক আবদুল কাদেরসহ স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই ফসলি জমি ও আবাসিক এলাকায় একের পর এক ভাটা গড়ে উঠছে। আর নিয়মনীতি না মেনে গড়ে ওঠা এসব ভাটার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুদের। অবাধে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ ও টায়ার। ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ফসল আবাদে ফেলছে বিরূপ প্রভাব। এতে ফসল উৎপাদনে বেগ পেতে হচ্ছে। তাদের উর্বর জমিতে বছরের বিভিন্ন সময়ে নানা ফসল আবাদ হলেও বর্তমানে ভাটার কালো ধোঁয়া আর তাপের কারণে অনুর্বর হয়ে পড়ছে জমি। জ্বলে যাচ্ছে ফসলাদি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসককে লিখিত অভিযোগ জানিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।

দক্ষিণ বঠিনা এলাকার সোলায়মান বলেন, ‘আবাসিক ও কৃষিজমিতে ইটভাটা নির্মাণ বেআইনি। তার পরও এই গ্রামের আশপাশে প্রায় ছয়টি ভাটা স্থাপন করা হয়েছে। ভাটা মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বললেও লাভ হয় না।’

ফাড়াবাড়ি এলাকার কার্তিক চন্দ্র রায় বলেন, ‘বাড়ির পাশে ভাটা হওয়ায় কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে ছোট ছেলেমেয়েদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাসার বাইরে রোদে কোনো কাপড়-চোপড় শুকাতে দিলেই তা আবার নোংরা হয়ে যায়।’

সালান্দর এলাকার কৃষক সাদেক হোসেন বলেন, ‘ইট তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করতে আবাদি জমির মাটি কেটে ভাটায় নিয়ে যাওয়ায় জমির উর্বরতা কমছে। ফলে এলাকায় কমে যাচ্ছে খাদ্যশস্যের উৎপাদনক্ষমতা।’

শিশুদের ভাটার কাজে ব্যবহার ও পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে কি না এম এ ব্রিকস ভাটার মালিক আনোয়ার হোসেন লালের কাছে তা জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, ভাটায় শিশুরা কাজ করছে—এটা তিনি জানেন না। আর ভাটা চালুর বিষয়ে অনুমতি পাওয়া যায়নি। তবে লাইসেন্স নবায়ন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের জন্য টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।

সামা ব্রিকস ভাটার মালিক হুমায়ুন কবীর জানান, ভাটার দ্বারা ফসলের কোনো ক্ষতি হয় না। আগুন মিস্ত্রিদের অসতর্কতায় আগুনের চুলার মুখ খোলা থাকার কারণে মাঝেমধ্যে তাপ ছড়িয়ে হয়তো সামান্য কিছু ক্ষতি হতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফতাব হোসেন বলেন, ‘ইট তৈরির জন্য ফসলি জমির মাটি কাটা হলে সে মাটি সম্পূর্ণরূপে অনুর্বর হয়ে পড়ে। এ জন্য লোকালয় ও দ্বিফসলি জমিতে ইটভাটা যেন না করা হয়, সে জন্য কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিরুৎসাহ করা হয়।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই ভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে স্বীকার করেছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, ‘ভাটার কাজে শিশুদের ব্যবহার করা দণ্ডণীয় অপরাধ। এ বিষয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি ভাটা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা