kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

দুই বাহিনীর ত্রাস

বাগমারায় চলছে হামলা-পাল্টাহামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী   

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দুই বাহিনীর ত্রাস

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাসুপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান আর তাঁর হাত ধরে উত্থান হওয়া জাবের আলী—এই দুজন আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন বাহিনী। দুই বাহিনী বিল, পুকুর দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। এ নিয়ে আতঙ্কে এলাকাবাসী।

পুলিশ, এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন চেয়ে হঠাৎ রাজনীতিতে আবির্ভূত হন এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান। এ কারণে তিনি স্কুলের চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য এনামুল হকের নিকটাত্মীয় হওয়ার সুবাদে তিনি সে সময় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচেন বিজয়ী হন। প্রধান শিক্ষক থেকে চেয়ারম্যান হয়ে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। এর জন্য তিনি জাবের আলীকে প্রশ্রয় দেন। চেয়ারম্যান লুৎফর কিছু পুকুর নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন। এ সময় তিনি মাছের খাদ্যের ব্যবসা চালু করেন। শুরুতে এই মাছের খাদ্য বেচার দায়িত্ব দেন জাবেরের ওপর। এভাবে দিনে দিনে জাবের চেয়ারম্যানের শক্তিশালী অনুসারীতে পরিণত হয়ে এলাকার বিল-খাল ও পুকুর দখল শুরু করেন।

স্থানীয়রা জানায়, জাবেরকে দিয়ে পশ্চিম নাককাটি, পূর্বনাককাটি, মরাসহ বেশ কিছু বিল দখলে মরিয়া হয়ে ওঠেন চেয়ারম্যান। তাঁর প্রশ্রয় পেয়ে জাবের হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। এভাবে কয়েক বছরের মাথায় তাঁর সুবাদে চেয়ারম্যান রাতারাতি কোটিপতি বনে যান। অন্যদিকে একসময়ের দিনমজুর জাবেরও হয়ে ওঠেন লাখোপতি। তবে ২০১৮ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা নিয়েও চরম ভরাডুবি হয় লুৎফরের। এ হারের পেছনে লুৎফর সন্দেহ করেন শিষ্য জাবেরকে। আর তখন থেকে শুরু হয় দুজনের মধ্যে উত্তেজনা। নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে দুই পক্ষই আলাদা বাহিনী গড়ে তুলতে থাকে।

এলাকাবাসী জানায়, এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩ ডিসেম্বর জাবের বাহিনীর হামলার শিকার হন চেয়ারম্যানের অনুসারী বীরকয়া গ্রামের মোবারক হোসেন (৪৫)। জাবের বাহিনীর লোকজন পিটিয়ে তাঁর হাত-পা ভেঙে দেয়। বর্তমানে তিনি পঙ্গু জীবন যাপন করছেন। এর সপ্তাহখানেক আগে জাবের বাহিনীর লোকজন হামলা চালায় মোবারকের স্ত্রী আঞ্জুরী বেগমের (৩৫) ওপর। তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে ঘুমন্ত আঞ্জুরী বেগমের ডান স্তন কেটে দেয়। এ ঘটনায় জাবেরসহ তাঁর বাহিনীর ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। একইভাবে জাবের বাহিনীর হামলার শিকার হন কুতুবপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন (৫৫)। এই হামলায় আনোয়ার এক পা হারিয়ে এখন স্ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন।

অন্যদিকে গত ১৯ ডিসেম্বর লুৎফর বাহিনীর লোকজন রাতের অন্ধকারে হামলা চালিয়ে জাবের বাহিনীর অন্যতম মোতালেব (২৫) নামে এক ভ্যানচালককে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয়। বর্তমানে ওই হামলায় মোতালেবও পুঙ্গত্ব জীবন যাপন করছেন। ভ্যান চালাতে না পেরে তিনি এখন পরিবার নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন।

এই হামলার ঘটনায় মোতালেব বাদী হয়ে লুৎফর বাহিনীর ১০ কর্মীর বিরুদ্ধে বাগমারা থানায় একটি মামলা করেন। উভয় পক্ষের মামলায় মন্দিয়াল, তেগাছি, হলুদঘর, বীরকয়া, খয়েরা, কুতুবপুর, জোতিনগঞ্জসহ ১০ গ্রামের লোকজনের মাঝে গ্রেপ্তার আতঙ্ক বিরাজ করছে। গ্রামগুলো এখন অনেকটা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।

মোতালেব দাবি করেন, ‘লুৎফরের মাধ্যমেই উত্থান হয়েছে জাবেরের। কিন্তু এখন লুৎফর উল্টো জাবেরকে শায়েস্তা করতে নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। এ কারণে আমাদের ওপরই চেয়ারম্যান বাহিনী হামলা করেছে।’

অন্যদিকে লুৎফর রহমান বলেন, ‘জাবের আলী একসময় আমার লোক ছিল। এখন সে চরম দুর্বৃত্ত। পুলিশের ওপর হামলা করে জাবেরকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সে এখন এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা না হলে এলাকায় শান্তি ফিরে আসবে না।’

এদিকে জাবের আলীকে গ্রেপ্তারে অব্যাহত চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে বাগমারা থানা পুলিশ। গত ১৯ ডিসেম্বর রাতে জ্যোতিনগঞ্জ বাজার থেকে জাবেরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই সময় মোটরসাইকেলে করে থানায় যাওয়ার পথে পুলিশকে ঘিরে ফেলে তাঁর কর্মীরা। তারা দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে আহত করে হাতকড়াসহ জাবেরকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এর পর থেকে জাবের আত্মগোপনে। তাঁর খোঁজে পুলিশ ঢাকা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে।

এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা থানার উপপরিদর্শক সৌরভ কুমার চন্দ্র জানান, বারবার স্থান পরিবর্তনের কারণে জাবের আলীকে গ্রেপ্তার করতে দেরি হচ্ছে। তবে তাকে যেকোনো উপায়ে গ্রেপ্তার করা হবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাগমারা থানার পরিদর্শক আতাউর রহমান বলেন, ‘দুজনের (লুৎফর-জাবের) কারণেই এলাকায় অশান্তি বেড়ে চলেছে। এখনো হামলা-পাল্টাহামলার শঙ্কা রয়েছে। আমরা উভয় মামলা তদন্ত করে দেখছি। এ ছাড়া জাবেরকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিমের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা