kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৬ নভেম্বর ২০২০। ১০ রবিউস সানি ১৪৪২

‘ফাও’ গ্যাসের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘ফাও’ গ্যাসের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার

এভাবেই প্লাস্টিকের চিকন পাইপ দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। ছবি : কালের কণ্ঠ

টিউবওয়েল বসানোর কাজে ব্যবহৃত পাইপ জমিতে বসানোর পর সেটা দিয়ে পানি ও গ্যাস বের হয়। এরপর একটি ড্রামে গ্যাস জমা করা হয়। সেখান থেকে প্লাস্টিকের চিকন পাইপ দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এ ধরনের গ্যাস লাইনের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের তিন ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে ‘ফাও’ গ্যাসের এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার বেড়েই চলেছে।

এ অবস্থায় মজলিশপুর ইউনিয়নের বাকাইল গ্রামে গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর অভিযান চালান ভ্রাম্যমাণ আদালত। ছয়টি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে এ অভিযান চলাকালে পাঁচ শতাধিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। নষ্ট করে ফেলা হয় কয়েক হাজার মিটার পাইপ ও কয়েকটি ড্রাম।

স্থানীয় লোকজন জানায়, সহজলভ্য হওয়া জমি থেকে ওঠা এসব গ্যাস তারা ব্যবহার করছে। এটাকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ওই টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তিন এলাকায় কয়েক হাজার লাইনের পাশাপাশি অর্ধশত কারাখানা গড়ে উঠেছে সেখানে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্লাস্টিকের পাইপের মাধ্যমে এভাবে গ্যাসের ব্যবহার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। পাইপের লিকেজ কিংবা অতিরিক্ত চাপে যেকোনো সময় ড্রাম ফেটে গিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সুহিলপুর বাজার থেকে বাকাইল বাজারে যাওয়ার সড়কে আশপাশে এ ধরনের সংযোগ রয়েছে। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই প্লাস্টিকের পাইপ। গাছের সঙ্গে এসব পাইপ বেঁধে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া হয়েছে।

গতকাল একে একে পাঁচ শতাধিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। নষ্ট করে ফেলা হয় ২০ হাজার মিটার পাইপ ও দেড় শতাধিক ড্রাম। জেলা ও সদর উপজেলা প্রশাসন, সদর থানা, ফায়ার সার্ভিস, বাখরাবাদ ও তিতাস গ্যাসফিল্ডের সমন্বয়ে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে আটজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অংশ নেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৫ সালের পর থেকেই এখানকার কিছু জমি থেকে গ্যাস উঠতে শুরু করে। নিজ নিজ জমি থেকে পাইপের মাধ্যমে গ্যাস তুলে বাড়ি, দোকান ও কারখানায় সংযোগ দেওয়া হয়। বাড়ি ও দোকানে সংযোগের জন্য চার শ থেকে পাঁচ শ টাকা নেওয়া হয়। কারখানাগুলো চালাচ্ছে এ ধরনের কাজে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালীরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে এভাবে গ্যাস সরবরাহকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে তারা। স্থানীয়ভাবে এ গ্যাসকে পকেট গ্যাস বলা হয়। বাকাইল এলাকার একাধিক স্থানে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্যাস ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে সতর্কীকরণ সাইন টানিয়েছে বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ডস কম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)।

বাকাইল গ্রামের মতি মিয়ার বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তাঁর ছেলের বউ সালেহা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দুপুরে গ্যাসের চুলায় পানি বসানোর পরপরই আগুন নিভে যায়। পরে জানতে পারি, অভিযান এসে লাইন কেটে দিয়েছে।’ নুরু মিয়া নামে এক ব্যক্তি এ বাড়ি থেকে গ্যাস ব্যবহারের টাকা নিতেন বলে জানা গেছে।

আব্দুল অহিদ নামের এক বৃদ্ধ বলেন, ‘পাঁচ-ছয় বছর ধরে এভাবে গ্যাস ব্যবহার করছি টাকার বিনিময়ে। অভিযানে লাইন কেটে দেওয়ায় ঝুঁকি থেকে বেঁচে গেলাম।’ মাঈনুদ্দিন নামের এক ব্যক্তি গ্যাস ব্যবহারের বিপরীতে মাসে পাঁচ শ টাকা করে নিতেন ওই বাড়ি থেকে।

মজলিশপুর ইউপি সদস্য মো. হাসান মিয়া বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরেই এভাবে গ্যাস ব্যবহার চলছে। স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী এটাকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে। অভিযান চালানো হলেও কোনো সফলতা আসে না।

অভিযানে থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ওসি মো. সেলিম উদ্দিন জানান, বিশাল এলাকাজুড়ে এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে মাইকিং করে যার যার বাড়ির পাশ থেকে গ্যাসের লাইন সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করা হবে।

ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে ওয়্যার হাউস ইন্সপেক্টর মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘এভাবে গ্যাস ব্যবহার বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই অভিযান চালানোর পাশাপাশি মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।’

বাখরাবাদ গ্যাসফিল্ডের ডিজিএম (বিতরণ) মো. জাহিদুর রহমান জানান, কূপের লিকেজের কারণে গ্যাস ওপরে উঠে এসেছে। এটা নিয়ন্ত্রণের কোনো

উপায় নেই। এক-দুই বছরের মধ্যে এটা এমনিতেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এভাবে গ্যাসের ব্যবহার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, আগেও সংযোগ

বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি একজনকে কারাদণ্ড ও একজনকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা