kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

খুলনা উপকূল

‘বুলবুলে’ ক্ষতিগ্রস্তরা ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে

কৌশিক দে, খুলনা   

৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘বুলবুলে’ ক্ষতিগ্রস্তরা ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে

‘আমার একটি ছোট ঘর ছিল, ভালোই ছিলাম। দুই মাস আগের ঝড় আমার সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই। এখন বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীর পোল্ট্রি মুরগির খামার ঘরের এক কোনায় থাকছি। দুর্গন্ধ লাগলেও এখন সব সইয়ে গেছে। অভাবে ঘরটি মেরামত করতে পারিনি।’

নিজের কষ্টের কথা বলছিলেন খুলনার কয়রা উপকূলীয় উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ও শাকবাড়িয়া নদীতীরবর্তী এলাকার গোলখালীর বাসিন্দা মাজেদা বেগম (৫৫)।

গত বছরের ১০ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে বেড়িবাঁধের তেমন ক্ষতি না হলেও এমন অনেক মাজেদা বেগমের ঘরবাড়ি বিনষ্ট হয়ে গেছে। নষ্ট হয়েছে ক্ষেতের ফসল। কিন্তু গত প্রায় দুই মাসেও তাঁরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।

খুলনা শহর থেকে সড়ক পথে এক শ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পৌঁছাতে হয় উপজেলা সদরে। কয়রা যাওয়ার পথে দেখা যায়, খুলনা-কয়রা সড়কের অনেক জায়গায় গাছের গোড়ার মাটি উপড়ে রাস্তার কার্পেটিং উঠে গেছে; কোথাও কোথাও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ঝড়ের পর ক্ষতিগ্রস্তদের স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকটাই কষ্টের দিন পার করছেন তাঁরা।

কয়রা লঞ্চঘাট এলাকার বাসিন্দা ইলিয়াস গাজী। পেশায় ভ্যানচালক তাঁর ঘরটি বুলবুলের হানায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। তিনি বলেন, ‘বুলবুলের তাণ্ডবে ঘর ভেঙে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে পাশের ইউনুস গাজীর বাড়িতে থাকছি। এখন পর্যন্ত কেউ সাহায্য-সহযোগিতা করেনি। কেউ কোনো খোঁজও নেয়নি।’

উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হরিহরপুর এলাকার বামাচরণ মণ্ডলের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে ঘূর্ণিঝড়। তিনি এখন পরিবার নিয়ে পাশের উপজেলা পাইকগাছায় শ্বশুরবাড়িতে থাকছেন। তাঁর আরেক ভাই নিত্যানন্দ মণ্ডল বাপ-দাদার পুরনো ভিটে ছেড়ে মাথা গুঁজেছেন বেড়িবাঁধের কাছে। নিত্যানন্দ মণ্ডল বলেন, ‘বাড়িঘর সব নষ্ট। মাটির ওপরে কোনোমতে ছেঁড়া ত্রিপল ঢাকা দিয়ে বাস করছি। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে।’

বুলবুলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন। ওই এলাকার কেউ গৃহহারা, কেউ ফসলহারা, কেউ মাছ শিকারের নৌকাহারা হয়েছেন। দক্ষিণ বেদকাশী ইউপি চেয়ারম্যান শামসুর রাহমান জানান, তাঁর ইউনিয়নে কয়েক হাজার বিঘা জমির মৎস্যঘের ভেসে গেছে। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে দুই হাজারের বেশি। তবে সরকারি সহযোগিতা হিসেবে পেয়েছেন মাত্র ৫৮ বান্ডিল টিন আর বান্ডিলপ্রতি তিন হাজার করে টাকা, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই সামান্য। তিনি বলেন, উপজেলা পরিষদে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হলেও এখন পর্যন্ত সবার জন্য ত্রাণসামগ্রী পাওয়া যায়নি।

কয়রা উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের দুই হাজার তিন শ ঘরবাড়ি একেবারেই বিধ্বস্ত হয়েছে। আর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চার হাজার আট শ ঘর। ৪৭১ হেক্টর জমির আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা ছাড়া উপজেলার তিন হাজার ২৬০টি মৎস্যঘের পানিতে ভেসে গেছে।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে সরকারিভাবে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৭০০ প্যাকেজ শুকনা খাবার বরাদ্দ পাওয়া যায়, যা তাৎক্ষণিকভাবে বিতরণ করা হয়েছে। তা ছাড়া ২৫০ বান্ডিল টিন ও সাত লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছি।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা