kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

যুদ্ধ করেও স্বীকৃতি নেই

দেবদাস মজুমদার, পিরোজপুর (আঞ্চলিক)   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



যুদ্ধ করেও স্বীকৃতি নেই

জনপ্রসাদ পাইক

৬৮ বছর বয়সী জনপ্রসাদ পাইক স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিলেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। তিন দফা আবেদন করলে প্রতিবারই যাচাই-বাছাই তালিকায় তাঁর নাম ওঠে। এর পরও তাঁর ভাগ্যে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির শিকে ছেঁড়েনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্টুডেন্ট ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউশন সাক্ষী। যুদ্ধের সময় ভারতের বসিরহাট নৈহাটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ধানিসাফা ইউনিয়নের ফুলঝুড়ি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা জনপ্রসাদ পাইক জীবনের শেষ বেলায় এসে স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন।

জনপ্রসাদ পাইক জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মঠবাড়িয়ার ফুলঝুড়ি গ্রামের সম্ভ্রান্ত কুমোদ বন্ধু পাইকের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প গড়ে ওঠে। তখন জনপ্রসাদ পাইক ১৯ বছরের কিশোর। স্থানীয় আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস ও আব্দুল মোতালেব শরীফ তখন পাকিস্তান আর্মিতে চাকরি করতেন। যুদ্ধের সময় তাঁরা দেশে এসে আর চাকরিতে যোগদান না করে ফুলঝুড়ি গ্রামের পাইকবাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প গড়ে তোলেন। জনপ্রসাদ প্রথমে ওই ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধার খবর সরবরাহ করতেন। ১৯৭১ সালের ১৬ মে স্থানীয় তুষখালী হাই স্কুল মাঠে শান্তিবাহিনী কমিটির সভাপতি আব্দুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ার (বর্তমানে যুদ্ধাপরাধে আমৃত্যু দণ্ডিত পলাতক আসামি) স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে সভা করেন। সেখানে তিনি নির্দেশ দেন, পাইকবাড়ীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের রাজ্জাক বিশ্বাস, মোতালেব শরীফসহ ওই ক্যাম্পের সবাইকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় আজই ধরে নিয়ে আসতে হবে।

এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিকেলে গ্রামে গুলির আওয়াজ শোনা যায়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধা মোতালেব শরীফ ও রাজ্জাক বিশ্বাসকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে জনপ্রসাদ পরিবারসহ আত্মগোপনে চলে যান। পরদিন পাইকবাড়ী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে আগুন ধরিয়ে জনপ্রসাদের বাড়িসহ ফুলঝুড়ি গ্রামের হিন্দুবাড়িতে লুটপাট চালায় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা। জনপ্রসাদের পরিবার ওই দিন নৌকাযোগে দেশ ছেড়ে পালানোর সময় বলেশ্বর নদের মাঝের চরে পাকিস্তানি বাহিনী ও তার দোসরদের হাতে ধরা পড়ে। যুবক জনপ্রসাদকে শরণখোলা (রায়েন্দা) মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে জনপ্রসাদের বাবা প্রয়াত জীতেন্দ্রনাথ পাইকের বাল্যবন্ধু এক রাজাকার যুবক জনপ্রসাদের প্রাণভিক্ষার ব্যবস্থা করলে তিনি মুক্তি পান। এরপর জনপ্রসাদ দেশের জন্য যুদ্ধে অংশ নেবেন বলে স্থির করেন। মিলিটারি ক্যাম্প থেকে ছাড়া পেয়ে শরণখোলায় এক আত্মীয়র বাড়িতে থাকা অবস্থায় স্থানীয় বগী ক্যাম্পের ২০-২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শরণেখোলায় এলে জনপ্রসাদ তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। বগী ক্যাম্পের নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট আলতাফ হোসেন। এরপর তিনি মঠবাড়িয়ার সাপলেজা, বামনার বুকাবুনীয় এলাকায় যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ভারতের বসিরহাটের নৈহাটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ইনচার্জ নিহার রঞ্জন হালদারের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন।

স্বাধীন হওয়ার পর জনপ্রসাদ কৃষি অধিদপ্তরে চাকরি নেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সাবসেক্টর সুন্দরবন অঞ্চলের ইয়াং অফিসার ও শরণখোলা থানার কমান্ডিং অফিসার মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুল হক মজনু বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ফুলঝুড়ি গ্রামের সম্ভ্রান্ত পাইকবাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল। যুবক জনপ্রসাদ পাইক একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা