kalerkantho

শনিবার । ২৫ জানুয়ারি ২০২০। ১১ মাঘ ১৪২৬। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

স্বাস্থ্য কর্তার ডেঙ্গুপ্রীতি

নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম

মোস্তাফিজার রহমান মিলন, হিলি (দিনাজপুর)   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বাস্থ্য কর্তার ডেঙ্গুপ্রীতি

সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলে কিটসহ চিকিৎসাসামগ্রী কেনার জন্য সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত ৫ আগস্ট দুই লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেয় অধিদপ্তর। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম এক লাখ ২৫ হাজার টাকার ডেঙ্গুর কিট কিনে বিল জমা দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি কোনো কিট কেনেননি।

উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া বিল ও ভাউচারে দেখা গেছে, একটি ওষুধ কম্পানির পাঁচটি ভাউচারে ২৫ হাজার টাকা করে এক লাখ ২৫ হাজার টাকার ডেঙ্গুর কিট কেনা হয়েছে। ওই কম্পানির বিপণন কর্মকর্তা গৌরাঙ্গ রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কম্পানির কোনো ডেঙ্গু কিট নেই। ডেঙ্গু কিট সরবরাহের কোনো প্রশ্নই আসে না।’ তবে তিনি নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনটি ভাউচারে ৯৭ হাজার টাকার প্যারাসিটামল জাতীয় বড়ি এবং স্যালাইন সরবরাহ করেছিলেন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিলের কথা বলে অতিরিক্ত পাঁচটি ফাঁকা ভাউচারের স্বাক্ষর নিয়েছিলেন।

কেনাকাটায় সিদ্ধহস্ত

তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া এবং হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী, গত ৭ ফেব্রুয়ারি অধিদপ্তর থেকে সরঞ্জাম কেনার জন্য ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। খায়রুল বিরামপুর উপজলার রুবিনা ফার্মেসি অ্যান্ড মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট নামের প্রতিষ্ঠানের তিনটি ভাউচারে ১২০টি বিপি মেশিন কেনা দেখিয়ে বরাদ্দের টাকা তুলে নেন। সরেজমিনে বিরামপুরে ওই নামের কোনো প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি।

এ বছর ২১ মে অধিদপ্তর থেকে সাবসেন্টার ও উপজেলার রোগীদের জন্য ওষুধ কেনার জন্য এক লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে। ডা. খায়রুল তিনটি সাবসেন্টার এবং তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রতিটির অনূকুলে ২৪ হাজার ৯৪৫ টাকার ভাউচার জমা দিয়ে টাকা তুলে নেন।

আফতাবগঞ্জ উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. তোজাম্মেল হক ও দাউদপুরের দিলবার হোসেন জানান, কোনো ওষুধ দেওয়া হয়নি। সাদা কাগজে ওষুধ বুঝে পাওয়ার স্বাক্ষর দিতে চাপ দেন খায়রুল। কিন্তু তাঁরা স্বাক্ষর দেননি।

এদিকে মালারপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রভাইডার বুলবুল আহম্মেদ, কাঁচদহের সাইফুল আলম এবং কচুয়ার কামরুজ্জামান জানান, তাঁদের ওষধ দেওয়া হয়নি। নগদ ১০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তা প্রত্যেককে ২৪ হাজার ৯৯৫ টাকার ভুয়া বিল ভাউচার জমা দিতে বাধ্য করেছেন।

 

টেবিলকাণ্ড

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে বেলাল ফার্নিচার থেকে খায়রুল গত ১৯ অক্টোবর মেহগনি কাঠের ৩ ফুট ৮ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, ২ ফুট ৫ ইঞ্চি প্রস্ত এবং ২ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার পাঁচটি টেবিল কেনেন। সেই সঙ্গে চারটি পাদানি কেনেন। ফার্নিচারের মালিক বেলাল হোসেন জানান, তিনি প্রতিটি টেবিলের দাম নিয়েছেন দুই হাজার ২০০ টাকা এবং প্রতিটি পাদানির দাম নিয়েছেন এক হাজার ২০০ টাকা। এ হিসেবে তিনি পেয়েছেন ১৫ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ প্রতিটি টেবিল ২৫ হাজার টাকা এবং একটি সেক্রেটারি টেবিল ৭৫ হাজার টাকা হিসেবে দেখিয়ে পাশের হাকিমপুর উপজেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বিদ্যুৎ ট্রেডার্সের গত ১৯ জুনের ভাউচার জমা দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দের দুই লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন খায়রুল। বিদ্যুৎ ট্রেডার্সের মালিক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো আসবাবপত্র সরবরাহ করেননি।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নামে পকেটভারী

তথ্য অধিকার আইন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পাঁচ দফায় হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ পাঁচ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে। এর মধ্যে ৭৮ হাজার টাকা ভ্যাট এবং ১০ হাজার ৪০০ টাকা আয়কর দেওয়া হয়। হাসপাতাল পরিষ্কার ও কাপড় ধোয়ার জন্য ঠিকাদারের বিল দেওয়া হয় ৬৮ হাজার টাকা। ডেঙ্গুর প্রকোপের সময় আগস্টে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ১৮ হাজার টাকা এবং একটি ট্যাংক পরিষ্কার বাবদ দেওয়া হয় তিন হাজার টাকা। এ ছাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় থেকে শ্রমিক দিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পরিচ্ছন্ন করা হয়। এ খাতে আর কোনো খরচ হয়নি বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান। কিন্তু খায়রুল ভুয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে বরাদ্দের চার লাখ ৩১ হাজার টাকা তুলেছেন।

জমা দেওয়া বিল ভাউচারে দেখা গেছে, গত ৫ আগস্ট উপজেলার আফতাবগঞ্জ, ভাদুরিয়া এবং দাউদপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ ১৫ হাজার করে টাকা বরাদ্দ দেন ডা. খায়রুল। কিন্তু আফতাবগঞ্জ উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. তোজাম্মেল হক, দাউদপুরের দিলবার হোসেন এবং আফতাবগঞ্জের শ্রী প্রাণনাথ তরফদার জানান, তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ কোনো টাকা দেননি স্বাস্থ্য কর্তা।

নবাবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. রেফাউল আলম জানান, উপজেলা পরিষদ, থানা এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার একটি প্রকল্প ছিল। এর আওতায় ৪০ দিন কর্মসূচির শ্রমিক দিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছিল।

আরো অভিযোগ

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের কোয়ার্টারে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ঘরে লাগানো রয়েছে একটি এসি। যেটি হাসপাতালে থাকার কথা। বিধি অনুযায়ী তাঁকে বাড়িভাড়া বাবদ ১৩ হাজার ৮০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু তিনি সেপ্টেম্বর থেকে একটি সিটের ভাড়া বাবদ এক হাজার ৩৮০ টাকা জমা দিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জ্যেষ্ঠ সেবিকা নিগার সুলতানা ও ফিরোজা বেগম অভিযোগ করেন, ডা. খায়রুল জ্যেষ্ঠ সেবিকাদের তাচ্ছিল্য করে ‘ওল্ড এজেজ’ (বুড়ি) বলেন।

উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহিনুর ইসলাম অভিযোগ করেন, ডা. খায়রুল ছাত্রলীগকে টোকাই সংগঠন বলেছেন। এ ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত স্টোরকিপার এম এম নূরে আলম সিদ্দিক এবং মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট মাহমুদ শরীফ জানান, ডা. খায়রুল ডেঙ্গুর কিট, বিপি মেশিন হাসপাতালে জমা দেননি। জোর করে তাঁদের কাছ থেকে খাতায় জমা দেখিয়ে স্বাক্ষর নেন।

এ বিষয়ে ডা. খায়রুল ইসলাম জানান, তিনি সব কিছু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস সহকারী সমর কুমার দেবের পরামর্শে করেছেন। কটূক্তির ঘটনায় তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। তবে সেবিকাদের কোনো কটূক্তি করেননি। কর্মচারীদের অনুরোধে হাসপাতালের এসি বাসায় নিয়ে গেছেন।

এ বিষয়ে অফিস সহকারী সমর কুমার দেব জানান, তিনি কখনো অবৈধ কাজের পরামর্শ দেন না। বরং তাঁকে অবৈধ কাজ করতে চাপ দিতেন ডা. খায়রুল।

দিনাজপুরের সিভিল সার্জন আব্দুল কুদ্দুস জানান, সব অভিযোগ তদন্ত করতে গত ১৩ নভেম্বর তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নূর নেওয়াজকে আহ্বায়ক এবং বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বুধবার তদন্ত শেষে কমিটির আহ্বায়ক ডা. নূর নেওয়াজ বলেন, ‘ডা. খায়রুলের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা