kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

হাওরের গলা চিপছে বাঁধ

বিলম্বে পানি নামায় বোরো চাষ নিয়ে শঙ্কা

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাওরের গলা চিপছে বাঁধ

অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে সুনামগঞ্জের কানলার হাওরের পানি নামছে বিলম্বে। ছবি : কালের কণ্ঠ

অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে হাওরের পানি বিলম্বে নামছে বলে অভিযোগ উঠছে। ফলে এবার বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কিত কৃষকরা। অন্যান্য বছর এই সময়ে এসে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টরেরও বেশি বীজতলা তৈরি হয়। কিন্তু এ বছর পানি না নামার কারণে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মাত্র পাঁচ হাজার ৪৯৪ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় সাড়ে তিন লাখ পরিবার বোরো চাষের সঙ্গে জড়িত। ২০১৯-২০২০ বোরো মৌসুমে দুই লাখ ১৯ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই জমি আবাদ করতে বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার ৬৫৬ হেক্টর। ১০ থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বীজতলা তৈরি করার কথা। এই সময় পার হয়ে গেলে নির্ধারিত সময়ে চারা লাগানো সম্ভব হয় না। যে কারণে জমিতে ফলন আসতেও বিলম্ব হয়। ফলে বিলম্বিত এই ফসল পাহাড়ি ঢলের আগ্রাসনে পড়ে ফসলহানি ঘটে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বীজতলা লাগানোর পর ৩০-৪০ দিন বয়সী চারা লাগাতে হয়। এই সময় পার হয়ে গেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে ফসল ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই এ বছর এখনো পানি না নামায় বোরোর কাঙ্ক্ষিত ফলন নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। এই সপ্তাহের মধ্যে পানি না নামলে কাঙ্ক্ষিত ফলনে বিরাট প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন কৃষিবিদরা।

সরেজমিন বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, এখনো হাওরে পানি রয়ে গেছে। পানি বিলম্বে নামার কারণে বীজতলা তৈরি ও চাষাবাদের জমি তৈরি করতে পারছে না কৃষক। বীজতলা ভেসে না ওঠায় অনেক কৃষক বীজতলার বদলে উঁচু শস্যক্ষেতে বীজ ফেলে তলা তৈরি করেছে। এই বিলম্বের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যত্রতত্র ফসল রক্ষা বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। তাই যথাসময়ে হাওরের পানি নামছে না। তবে কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, অক্টোবরের শেষ দিকে বৃষ্টিপাতের কারণে হাওরে পানি বেড়েছিল। তাই পানি নামতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে কোনো কোনো হাওরে অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় পানি সরছে না।

প্রাকৃতিক এই সংকটের পাশাপাশি কৃষক কাঙ্ক্ষিত ধানের মূল্য না পাওয়ায় হাওরের জমি চাষাবাদে এখন উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে হাওরের সচ্ছল ও বড় কৃষকরা নিজেরা জমি না করে এককালীন টাকা নিয়ে ছোট কৃষক ও বর্গাচাষিদের জমি বন্ধক দিয়ে থাকে। কিন্তু এই চাষিরা শ্রম-ঘাম ও ঋণ নিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলন ফলিয়েও বাজারে ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ হয়ে এখন চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। দিরাই, জামালগঞ্জ, শাল্লা, তাহিরপুর ও ধর্মপাশায় এবার বড় কৃষকদের জমি পতিত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা পরিষদের সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, হাওরের কৃষক প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে। কোনটা প্রাকৃতিক, কোনটা মানবসৃষ্ট। যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রবিউল হক মজুমদার বলেন, ‘আমি বিভিন্ন উপজেলার হাওর ঘুরে দেখেছি, বেশির ভাগ হাওরেরই পানি আটকে আছে। পানি আটকে থাকার কারণে বীজতলা তৈরি সম্ভব হচ্ছে না। কৃষকরা আমাদের জানিয়েছে, অপরিকল্পিত ও যত্রতত্র বাঁধ পানি বিলম্বে নামার কারণ।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ২২টি টিম হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজের প্রাক্কলন করছে। তবে পানি বিলম্বে নামার কারণে কিছু হাওরে প্রাক্কলন প্রস্তুত করতে সমস্যা হচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা