kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

নিকলীর ক্যাসিনো নজরুল

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিকলীর ক্যাসিনো নজরুল

অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ক্যাসিনো খেলায় পারদর্শী নজরুল ইসলাম (৩৫) কিশোরগঞ্জের নিকলী সদর ইউনিয়নের কুর্শা পশ্চিমপাড়ার মো. রূপালীর ছেলে। ভিয়েনায় জামান কামরুজ (কামরুজ্জামান) নামে পরিচিত নজরুল ‘আদম ব্যবসা’র জন্য সে দেশের ব্যাংক বাওয়াগ ও ব্যাংক অস্ট্রিয়া থেকে প্রায় ৫০ হাজার ইউরো (৫০ লাখ টাকা) ঋণ নিয়ে খেলাপি হন। দারিদ্র্যপীড়িত সার্বিয়ার মেয়েদের কৌশলে তিনি বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। পরে ওই মেয়েদের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট ম্যারেজের মাধ্যমে উচ্চ বেতনে ইউরোপে চাকরির প্রলোভনে ফেলে বাংলাদেশের বহু যুবককে পথে বসিয়েছেন নজরুল। অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।

অস্ট্রিয়ায় বসবাসরত কিশোরগঞ্জের একাধিক ব্যক্তি নজরুলের এসব কর্মকাণ্ডের তথ্য জানিয়ে বলেন, ২০০০ সাল নাগাদ অস্ট্রিয়ায় গিয়ে নজরুল নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। ক্যাসিনোতে নিয়মিত যাতায়াত শুরু হয় তাঁর। জুয়ার পাশাপাশি আসক্ত হন নেশায়। বিভিন্ন দেশের মাদক কারবারির সঙ্গে হেরোইন-কোকেনসহ নেশাদ্রব্যের কারবার শুরু করেন। এসব কারণে পুলিশ তাঁর পিছু নেয়। একপর্যায়ে নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০১৪ সালে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন নজরুল। ভিয়েনার আদালতে তাঁর চার বছরের সাজা হয়।

ভিয়েনায় বসবাসরত নিকলী সদর ইউনিয়নের কুর্শা গ্রামের সাইদুর রহমান, জায়েদুর রহমানসহ কয়েকজন জানান, এক বছরের সাজা মওকুফ হয় নজরুলের। তিন বছর সাজা খেটে ২০১৭ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি আবারও অপরাধে জড়ান। অন্যদিকে ব্যাংক থেকে নেওয়া টাকা পরিশোধ না করায় সুদে-আসলে তা কোটিতে (প্রায় এক লাখ ইউরো) দাঁড়ায়। নজরুল খেলাপি হয়ে পড়লে পুলিশ তাঁকে আবারও ধাওয়া করে। পুলিশের তাড়া খেয়ে নজরুল সম্প্রতি পালিয়ে দেশে চলে আসেন।

এদিকে দেশে ফিরে আসার পর পাওনাদাররা টাকা ফেরত চাইলে নজরুল তাঁদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। নিকলীর আঠারবাড়িয়া গ্রামের জামশেদ আলী অভিযোগ করেন, নজরুল তাঁকে ইউরোপে নেওয়ার কথা বলে টাকা নেন। কিন্তু তাঁকে বিদেশে নেননি, টাকাও ফেরত দেননি। সম্প্রতি নজরুল দেশে এলে তিনি টাকা ফেরত চান। তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে হত্যার জন্য নজরুল সন্ত্রাসী লাগিয়ে দেন। গত ২ অক্টোবর ব্যক্তিগত কাজে তিনি বাজিতপুরে গেলে সন্ত্রাসীরা পিস্তল নিয়ে তাঁকে ধাওয়া করে। পরে স্থানীয় এক সাংবাদিকের সহায়তায় তিনি রক্ষা পান। বর্তমানে সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে তিনি বাড়ি থেকে বেরোতে পারছেন না। জানতে পেরে স্থানীয় সংসদ সদস্য এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

মানুষ ঠকিয়ে নজরুল ইসলাম এখন শতকোটি টাকার মালিক। ভুক্তভোগী, এলাকাবাসী, পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, উচ্চ বেতনের স্বপ্ন দেখিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নেওয়ার কথা বলে বহু মানুষের টাকা মেরেছেন তিনি। কাউকে সার্বিয়া বা জার্মানি পর্যন্ত নিয়ে জিম্মি করে নির্যাতন চালিয়ে টাকা আদায় করেন। তাঁর প্রতারণার শিকার হয়ে নিকলী, কটিয়াদী, কুলিয়ারচর, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার শতাধিক যুবক পথে বসেছেন।

জানা যায়, অস্ট্রিয়ায় যাওয়ার সময় ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়া নজরুল কামরুজ্জামান নামের এক প্রতিবেশীর এসএসসির সনদ জাল করেন। বিদেশে নজরুল ‘কামরুজ্জামান’ নামেই ছিলেন। গ্রামবাসীর অভিযোগ, গত সেপ্টেম্বরে নজরুল পালিয়ে দেশে আসার পর বাড়িতে মাদকসেবীদের আখড়া বানিয়েছেন। গত মঙ্গলবার চিহ্নিত ইয়াবা ডিলার আব্দুল হামিদের বাড়িতে ইয়াবা সেবনের খবর পেয়ে নিকলী থানার পুলিশ গিয়ে বাড়ি ঘেরাও করে। এ সময় তিনজনকে আটক করলেও পুলিশ নজরুল ও হামিদকে ছেড়ে দেয়।

প্রতারণার শিকার কুলিয়ারচর উপজেলার ভরাডুল গ্রামের মো. আবুল বাশার জানান, তাঁর কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা নেন নজরুল। সার্বিয়া থেকে নিয়ে আসা তরুণীর সঙ্গে কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করিয়ে তাঁকে সে দেশে নিয়ে নির্যাতন করে আরো তিন লাখ টাকা আদায় করা হয়। সেখানে তিনি প্রায় আড়াই মাস উপোস অবস্থায় একটি ঘরে বন্দি থাকেন। পরে কৌশলে পালিয়ে ভারতীয় দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরে আসেন। বহু দেনদরবার করে ১২ লাখের মধ্যে দুই লাখ টাকা আদায় করতে পেরেছেন।

তা ছাড়া নজরুলের প্রতারণার শিকার হয়েছেন কটিয়াদীর করুয়াপাড়ার ইসলাম উদ্দিন ও কাজী হান্নান, সুতি আটখোলার আজিজুল পাঠান ও ডাব্লিও, বনগ্রামের শফিকুল ইসলাম, মানিকখালীর সজীব, পাকুন্দিয়ার পুলেরঘাটের সুমন মিয়া, নিকলী সদরের ভজন বর্মণ, ঢাকার ডেমরার আব্দুল মোতালিব এবং মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরের অন্তত ১০ যুবক। এমন আরো শতাধিক যুবকের সঙ্গে নজরুল প্রতারণা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১০ জন টাকা ফেরত পেতে নজরুলসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এসব মামলায় নজরুলের বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খাটেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা