kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

জয়পুরহাট

বালু উত্তোলন থামছেই না

আলমগীর চৌধুরী, জয়পুরহাট   

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বালু উত্তোলন থামছেই না

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার তুলসীগঙ্গা নদীর মালন্দা ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে নদীর বুকে শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করার কাজ চলছে। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

নদীর বুকে বাঁশ, কাঠ ও প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে ভেলা বানিয়ে তাতে শ্যালো মেশিন বসিয়ে বোরিং করে তুলশীগঙ্গা নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। সেই বালু ট্রাকে ট্রাকে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় প্রশাসন একাধিকবার অভিযান চালিয়ে বালু সংগ্রহে ব্যবহৃত শ্যালো মেশিনসহ যাবতীয় সামগ্রী আগুন দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েও বন্ধ করতে পারছে না অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। বারবার অভিযানের পরও বালু উত্তোলন বন্ধ না হওয়ায় নদীর দুই পারে ভাঙন শুরু হয়েছে। জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার পশ্চিম অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত তুলশীগঙ্গা নদীর বিভিন্ন স্পট ঘুরে ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তুলশীগঙ্গা নদীর সন্ন্যাসতলী সেতুর পশ্চিম অংশে প্রায় দেড় শ মিটার দক্ষিণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কেটে বালু ব্যবসায়ীরা সড়ক নির্মাণ করেছেন। নদী থেকে শ্যালো মেশিন দিয়ে বোরিং করে সংগ্রহ করা বালু ওই সড়ক পথে ট্রাক্টর দিয়ে জামালগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করা হচ্ছে। অবৈধভাবে ওই স্পটে বালু সংগ্রহ করে তা বিক্রি করছেন ক্ষেতলালের সমন্তাহার গ্রামের আব্দুল কাদের। খবর পেয়ে গত ২২ অক্টোবর বিকেলে সেখানে অভিযান চালান ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত রহমান। অভিযানে বালু সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা তিনটি শ্যালো মেশিন জব্দসহ ইউএনও বেশ কিছু প্লাস্টিকের পাইপ পুড়িয়ে দেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে আব্দুল কাদেরকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে শ্যালো মেশিনগুলো নিলামে বিক্রি করা হয়। এরপর বালু তোলা বন্ধ হলেও ওই স্পটে জমা করা বালু প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ অভিযান চালানোর সময় ইউএনও নদী থেকে সংগ্রহ করা বালু নদীতে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ স্পট থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে তুলশীগঙ্গা নদীর মালন্দ ঘাট। এ ঘাটটিও ক্ষেতলাল উপজেলার অন্তর্গত। অথচ এই ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে শ্যালো মেশিন বসিয়ে দেদারছে বালু তুলে বিক্রি করছেন পার্শ্ববর্তী আক্কেলপুর উপজেলার আওয়ালগাড়ী গ্রামের বালু ব্যবসায়ী বিপ্লব হোসেন। বিপ্লব আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁর ভাই আক্কেলপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান। এলাকায় তাঁরা প্রভাবশালী হওয়ায় নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুললেও কেউ বাধা দেওয়ার সাহস রাখে না। দীর্ঘদিন ধরে বালু তোলার কারণে মালন্দ এলাকায় নদীর তীরবর্তী জমিগুলো এরই মধ্যে ভাঙতে শুরু করেছে।

স্থানীয় কৃষক জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘তুলশীগঙ্গা নদীর বুকে শ্যালো মেশিন দিয়ে বোরিং করে বালু তুলে বিক্রির কাজ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রশাসন আসে। মেশিনসহ ধরেও নিয়ে যায়। কিন্তু আবার বালু তোলা শুরু হয়।’ ক্ষেতলাল উপজেলার আমিড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল গনি বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন বারবার অভিযান চালায়, কিন্তু বালু তোলা বন্ধ হয় না। প্রশাসনকে টাকা দিয়ে তারা আবার বালু তোলা শুরু করে।’

একই এলাকার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘নদীর দুই পার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। সেই বাঁধের ওপর দিয়ে অনবরত বালুর ট্রাক্টর যাতায়াত করে। এর ফলে বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। জায়গায় জায়গায় বড় বড় গর্ত হয়েছে। মাঠ থেকে ফসল ঘরে তুলতে ভাঙা বাঁধে যাতায়াত করতে আমাদের নানা বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে।’

ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত বলেন, ‘এর আগে তিনবার অভিযান চালিয়ে মালামাল জব্দ ও জরিমানা করেছি কিন্তু অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধ করা যায়নি। গত বৃহস্পতিবার অভিযান চালিয়ে মালামাল জব্দ করে আগুন দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। তা ছাড়া আটক দুলাল হোসেন শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু তোলার কাজে অত্যন্ত অভিজ্ঞ। এলাকাবাসীর মাধ্যমে সেটা নিশ্চিত হয়েই তাঁকেসহ জড়িত তিনজনকে আটক করে সাজা দেওয়া হয়েছে।’

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক জাকির হোসেন বলেন, ‘অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বৃহস্পতিবার অভিযান চালিয়ে ক্ষেতলালে মেশিনপত্র আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’ বারবার অভিযানের পরও বালু তোলা বন্ধ হচ্ছে না কেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যতবার তারা বালু তুলবে ততবারই অভিযান চালানো হবে। প্রয়োজনে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে বালু লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা