kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

কাঠমিস্ত্রির সরঞ্জামে ময়নাতদন্ত

অমিতাভ দাশ হিমুন, গাইবান্ধা   

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কাঠমিস্ত্রির সরঞ্জামে ময়নাতদন্ত

গাইবান্ধা শহরের মধ্যপাড়ায় সদর হাসপাতালের স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে ময়নাতদন্ত ঘর। ইনসেটে লাশ কাটায় ব্যবহৃত বাটালি, হাতুড়ি, স্কেল, কাঁচি। ছবি : কালের কণ্ঠ

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে ভূতুড়ে পরিবেশে মধ্যযুগীয় কায়দায় কাঠমিস্ত্রির হাতুড়ি, বাটালি ও ছেনি দিয়ে ময়নাতদন্তের কাজ করা হয়। উঁকি মেরে ভেতরের দৃশ্য দেখে এসে মর্গের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা স্থানীয় কবি মানিক বাহার বলেন, ‘শান্তির ঘুমপ্রত্যাশী জীবনানন্দ দাশ লাশ কাটা ঘরের এ চেহারা দেখলে নতুন করে কবিতা লিখতেন।’ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, ডোম ও হাসপাতালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও স্বীকার করেন, প্রাণের স্পন্দনহীন দেহ হলেও ব্যাপারটি সত্যিই অমানবিক। তবে তাঁদের অজুহাত, এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি।

ক্রমাগত রোগীর চাপ বাড়ায় পরে ১৯৮৪ সালে ডিবি রোড ও কলেজ রোডের মধ্যবর্তী এলাকায় নির্মাণ করা হয় ৫০ শয্যার সদর আধুনিক হাসপাতাল। সেখানে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ কাটা ঘরও রাখা হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতির সুবিধাহীন ওই অপরিসর ঘরে সেই থেকে ময়নাতদন্তের কাজ চলছে। এরপর গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতাল নামে ২০০ শয্যায় উন্নীত হলেও এটি চলছে সেই ৫০ শয্যার জনবল দিয়ে। ময়নাতদন্তকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় মেডিক্যাল অফিসাররাই চালাচ্ছেন ময়নাতদন্তের কাজ। একজন ডোম এ কাজে সহায়তা করেন।

মর্গ ঘুরে দেখা গেছে, ময়নাতদন্ত কেন্দ্রের করুণ চিত্র। এক মাস ধরে সেখানে বিদ্যুৎ নেই। ঘর থেকে রক্তসহ অন্য বর্জ্য ফেলার ড্রেনটি প্রায় অকেজো। কর্তব্যরত মেডিক্যাল অফিসার ডা. মাসুদার রহমান জানালেন, অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করতে হয়। আলোস্বল্পতার কারণে বিকেল ৫টার পর কোনো কাজ করা যায় না। মরদেহ রাখার হিমাগার না থাকায় পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। ডিপ ফ্রিজ না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ ডিএনএ টেস্টের উপাদান ও অন্যান্য স্যাম্পল রাখার সুযোগ থাকে না। হাড় বা মাথার খুলি কাটার ইলেকট্রিক মেশিন না থাকায় ব্যবহার করা হয় হাতুড়ি, বাটালি ও ছেনি। এতে অতিরিক্ত ক্ষত সৃষ্টির সুযোগ থাকে। তিনি বলেন, গন্ধে অসহ্য লাগলে মশার কয়েল জ্বালিয়ে কাজ করা হয়।

এদিকে লাশ কাটা ঘরের পাশেই ডায়রিয়া ওয়ার্ড ও ইমারজেন্সি রুম। সেখানে সব সময় রোগীর ভিড় থাকে। কখনো কখনো মরদেহের পচা গন্ধে সেখানকার রোগীরা চিকিৎসা নিতে অস্বস্তি বোধ করে।

শামসুন্নাহার নামে এক ডায়রিয়া রোগীর স্বজন বলেন, তিনি তিন দিন ধরে সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করেন। মাঝেমধ্যে পচা লাশের গন্ধে সব সময় নাকে-মুখে কাপড় গুঁজে রাখতে হয়। অন্যদিকে ভয় ভয়ও লাগে।

তবে ময়নাতদন্ত নিয়ে যথেষ্ট অভিযোগও রয়েছে। হাসপাতালের পরিস্থিতি নিয়ে আন্দোলনে অন্যতম নেতৃত্বদানকারী জেলা সিপিবির সভাপতি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য মিহির ঘোষ বলেন, ‘অপরিচ্ছন্ন এ হাসপাতালের সর্বত্র অনিয়ম ও দুর্নীতির চিহ্ন। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ এলে কেমিক্যাল কেনাসহ সংশ্লিষ্টদের তুষ্ট করতে স্বজনদের ব্যয় কখনো কখনো পাঁচ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে মরদেহ ভ্যানে আনা-নেওয়ার খরচও দিতে হয়। এতে দরিদ্র মানুষেরা বিপাকে পড়ে।’

সমাজসেবী অ্যাডভোকেট মুরাদজজ্জামান রব্বানী বলেন, ‘এ হাসপাতালের নানামুখী সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাশ কাটা ঘর বা মর্গটি। আত্মহত্যা, অপমৃত্যু, খুনসহ নানা ঘটনার অনুসন্ধানে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ। জেলার সাত উপজেলা থেকে প্রায় প্রতিদিনই মরদেহ আসে। অথচ সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটির জন্য কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেই, এটি দুঃখজনক।’

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাহফুজার রহমান লাশ কাটা ঘরের দুরবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘বিশেষজ্ঞ না থাকায় মেডিক্যাল অফিসাররা নানাভাবে কাজ শিখে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেডিক্যাল অফিসারের পদায়নের জন্য এবং সমস্যা সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা