kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

লাল পাহাড়ে কালো থাবা

মির্জাপুরে মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়

এরশাদ মিঞা, মির্জাপুর (টাঙ্গাইল)   

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লাল পাহাড়ে কালো থাবা

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার তরফপুর ইউনিয়নের টাকিয়া কদমা গ্রামে পাহাড় কেটে ভাটায় নেওয়া হয়েছে মাটি (বাঁয়ে); ঘাটাইলের জুগিয়াটেঙ্গর এলাকায় ভেকু দিয়ে কাটা হচ্ছে পাহাড়। ছবি : কালের কণ্ঠ

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে প্রভাবশালী একটি মহল পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে। পাহাড়ের শ্রেণি পরিবর্তন করে লাল মাটি স্থানীয় কয়েকটি ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা বাড়ছে, অন্যদিকে গ্রামীণ রাস্তার ক্ষতি হচ্ছে। এমনই চিত্র দেখা গেছে উপজেলার তরফপুর ইউনিয়নের টাকিয়া কদমা (ভূঁইয়াপাড়া) ও দিগলচালা এলাকায়। এতে প্রভাবশালী মহল আর্থিকভাবে লাভবান হলেও পাহাড়ধসের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে আশপাশের মানুষ। এ ছাড়া বড় বড় মাটি ভর্তি ড্রাম ট্রাক চালিয়ে গ্রামীণ রাস্তা নষ্ট করা হচ্ছে।

বর্তমানে পৌরসভার ত্রিমোহন এলাকায় একাব্বর হোসেন এমপি সেতুর নিচে ভেকু মেশিন দিয়ে কাটা হচ্ছে মাটি। এতে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মির্জাপুর উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলের তরফপুর ইউনিয়নের টাকিয়া কদমা ও দিগলচালা এলাকায় পাহাড় কেটে সমতল ভূমি বানিয়ে বাড়ি বানানোর নাম করে দুটি ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। পাহাড়ের ওই লাল মাটি স্থানীয় কয়েকটি ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। বড় বড় টিলা ভেকু মেশিন দিয়ে কাটা হচ্ছে। আর ওই সব টিলার লাল মাটি শত শত ড্রাম ট্রাকে ভরে নেওয়া হচ্ছে স্থানীয় ইটভাটায়। মাটি ভর্তি ড্রাম ট্রাক চলাচলে দুর্ভোগে পড়েছে গ্রামের মানুষ। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ওই সব সড়ক দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

পাহাড়ি এলাকায় মাটি কাটছেন বাঁশতৈল এলাকার রোকন মিয়া, শহিদুল ইসলাম ও ত্রিমোহন এলাকায় এবাদত মৃধা। মাটি ভর্তি ট্রাক চলাচলের কারণে আঞ্চলিক পাকা সড়কগুলো নষ্ট হচ্ছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গ্রামীণ রাস্তা ভেঙে নষ্ট হলেও অবৈধভাবে মাটির ব্যবসা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কয়েকজন প্রভাবশালী।

প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে একশ্রেণির মাটি ব্যবসায়ী ভেকু মেশিন দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মাটি কেটে অন্যত্র বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রতিবছরের মতো এ বছরও প্রভাবশালী মহল কয়েকটি স্থানে ১৫ দিন ধরে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটা শুরু করেছে। উপজেলার পাহাড় ও টিলার ভোগদখলকারীদের রাস্তার সমতল করে বাড়ি বানানোর উপযুক্ত জমি বানিয়ে দেওয়ার নাম করে উঁচু পাহাড় ও টিলা কেটে লাল মাটি নিচ্ছে। অনেকে সবজি চাষের উপযোগী ও মাছ চাষের জন্য পুকুর তৈরি করতেও পাহাড় বা টিলার মাটি বিক্রি করে থাকে। এ সুযোগে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বন বিভাগের উঁচু পাহাড়ও কাটা হয় বলে স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছে। এ কারণে বেশির ভাগ পাহাড়ের গজারি, আম, কাঁঠাল, সেগুন, আকাশমণি, মেহগনি, ইউক্যালিপটাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছও কাটা পড়ছে। ফলে পাহাড়ি এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

টাকিয়া কদমা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম জানান, সমতল স্থানে বাড়ি বানানোর জন্য রোকন নামের এক মাটি ব্যবসায়ীর কাছে টিলার প্রতি ট্রাক মাটি ৩৫০ টাকায় বিক্রি করেছেন।

লতিফপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম বলেন, ‘বর্তমান সরকার মির্জাপুরের আঞ্চলিক সড়কগুলো পাকা করে দিয়েছে। আর মাটি ব্যবসায়ীরা ড্রাম ট্রাক চালিয়ে তা ধ্বংস করছে। আমরা এলাকাবাসী মাটি ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি। কোনো রকমে বেঁচে আছি।’

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। পূর্বানুমতি ব্যতীত জমির শ্রেণি পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। পাহাড় ও টিলা কাটার বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।’

 

ঘাটাইলে টিলা কাটার উৎসব

নজরুল ইসলাম, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল)

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের পাহাড়িয়া এলাকায় অবাধে চলছে লাল মাটির টিলা কাটার মহোৎসব। আর পাহাড় ও টিলার মাটি বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটায়। তা ছাড়া পাহাড়ের মাটি দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে পুকুর ও নিচু জমি। বিভিন্ন ফসল ও সবজি আবাদের নাম করে কিংবা বাড়িঘর নির্মাণের কথা বলে ২০-৩০ ফুট উঁচু টিলা কেটে সমতল ভূমিতে পরিণত করা হচ্ছে।

বন বিভাগের সংরক্ষিত জমিতে এক্সকেভেটর (ভেকু) দিয়ে পাহাড় কাটার মহোৎসব চললেও এ ব্যাপারে বন বিভাগ কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের কোনো মাথাব্যথা নেই। এভাবে পাহাড় কাটার ফলে পরিবেশ বির্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।

উপজেলার পাহাড়িয়া এলাকার সাতটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ পাহাড় ও টিলা কাটার চিহ্ন রয়েছে। উপজেলার জুগিয়াটেংগর, মাকরাই, ঘোড়ামারা, পাঞ্জাচালা, হরিণাচালা, তেঘড়ি, সন্ধানপুর ইউনিয়নের পাড়বাহুলী, চৌরাশা, মাইধারচালায় গিয়ে দেখা যায়, ফসল ও সবজি আবাদের নাম করে পাহাড় ও টিলা কেটে সমতল ভূমি বানানো হচ্ছে। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির মাটি ব্যবসায়ীরা মাসের পর মাস ভেকু দিয়ে পাহাড় ও টিলার লাল মাটি কেটে আশপাশের ইটভাটা মালিকদের কাছে বিক্রি করছেন।

ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের জুগিয়াটেংগর গ্রামের আবুবকর মিয়া, আবুল হোসেন ও তাঁর ভাই নুরুল ইসলাম দুটি বড় টিলার গাছ ও মাটি কেটে বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে ওই এলাকা এখন অনেকটাই সমতল জমিতে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে আবুল হোসেন ও নুরুল ইসলাম নুরু জানান, টিলা হলেও জমিটি তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি। নিজেদের প্রয়োজনে তাঁদের রোপণ করা গাছ কেটে মাটি বিক্রি করেছেন।

এ ব্যাপারে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘বছরের পর বছর যেভাবে পাহাড় কাটা চলছে তা অব্যাহত থাকলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা