kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বদলি আগ্রাসনে বঞ্চিত স্থানীয়রা

কিশোরগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেদের স্থায়ী ঠিকানায় চাকরি পেয়ে থাকেন। এ পদে নারীরা চাকরি পান স্বামী কিংবা বাবার স্থায়ী ঠিকানায়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধানে শিক্ষকদের স্বামী বা স্ত্রীর কর্মস্থলে বদলির নিয়ম রয়েছে। এর বাইরে ‘জনস্বার্থে’ আরো ২০ শতাংশ বদলির সুযোগ আছে। তবে কিশোরগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষকদের এই বদলি ব্যবস্থার মারাত্মক অপব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এটাকে বদলি ‘আগ্রাসন’ বলছেন কেউ কেউ।

অস্বাভাবিক হারে বদলির কারণে শূন্য পদ না থাকায় কিশোরগঞ্জ সদর, করিমগঞ্জ, তাড়াইল ও ভৈরব—এ চার উপজেলার চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণীরা এবার প্রাথমিক শিক্ষক পদে চাকরি পাচ্ছেন না। এমনকি আগামী কয়েক বছরেও চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছে শিক্ষা অফিসের সূত্রগুলো। জানা গেছে, এসব উপজেলায় কোনো শিক্ষকের পদ শূন্য হলে বদলির মাধ্যমে ঝড়ের বেগে তা পূরণ হয়ে যায়। আর এই বদলির পেছনে লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য হচ্ছে বলে শোনা যায়। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের কেউ অভিযোগটি স্বীকার করেন না।

বিশেষ করে জেলার হাওর অধ্যুষিত উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের শিক্ষকরা বানের জলের মতো বদলি হয়ে ঢুকে যাচ্ছেন উজানের উপজেলাগুলোতে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেউ স্বামী বা স্ত্রীর কর্মস্থলে, কেউবা নদীভাঙনে বাড়িঘর হারানো, কেউ আবার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার কারণ দেখিয়ে বদলি হচ্ছেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের একটি সূত্র বলছে, বদলির আবেদনে যেসব কাগজপত্র দেওয়া হয় অনেক সময় সেগুলো যাচাই করেও দেখা হয় না। তা ছাড়া বদলির জন্য সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, ক্ষমতাসীন দলের নেতা, বড় কর্মকর্তা—এমনকি দেশের সর্বোচ্চ ঊর্ধ্বতন জায়গা থেকে সুপারিশ ও নির্দেশ আসে। ফলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কিছুই করার থাকে না।

কিশোরগঞ্জ সদরের উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুল হক খান বলেন, ‘আমি তিন বছর হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামে ছিলাম। সেখানে আমার হাত দিয়ে ৩৯ জন শিক্ষক সদর, ভৈরবসহ বিভিন্ন উপজেলায় বদলি হয়ে গেছেন। বর্তমানে ২০ শতাংশ বদলির বিধানে সদরে ৮৮ জন বহিরাগত শিক্ষক রয়েছেন।’

আরেকটি সূত্র বলছে, এই ২০ শতাংশসহ বৈবাহিক সূত্র মিলিয়ে সদরে অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ বদলির শিক্ষক রয়েছেন। তাই এখানে কোনো শূন্যপদ নেই। সদর উপজেলার ১৪২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৯৭১ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা শাখার সভাপতি আসাদুজ্জামান খান দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘বদলি নিয়মের অপব্যবহারের কারণে সদরসহ উজানের অন্তত চারটি উপজেলার চাকরিপ্রত্যাশীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। পরিকল্পিতভাবে শূন্যপদগুলো দখল করে রেখেছেন বহিরাগতরা। এটা রীতিমতো আগ্রাসন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শিক্ষক পদে সদরের কেউ চাকরি পাবেন না। যদি ওই সময়ও বদলি অব্যাহত থাকে, তাহলে এ বঞ্চনা আরো দীর্ঘায়িত হবে।’

করিমগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি শামসুল হক ফরহাদ বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলির নিয়ম রদবদল না হলে কিশোরগঞ্জ সদর, করিমগঞ্জ, তাড়াইল ও ভৈরবের মতো এলাকাগুলোর চাকরিপ্রত্যাশীদের বঞ্চনার অবসান হবে না।’

করিমগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মফিজুল হক বলেন, ‘নিয়ম থাকার কারণে এই বদলির স্রোত থামানো যাচ্ছে না।’ কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুব্রত কুমার বণিক বলেন, ‘আমি সমস্যাটি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব।’

কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের নারী শিক্ষকরা বৈবাহিক সূত্রে করিমগঞ্জ ও তাড়াইলের শূন্যপদগুলো দখল করেছেন। ফলে শিক্ষক নিয়োগের সময় স্থানীয়রা চাকরি পাচ্ছেন না। বিষয়টি নিয়ে আমি নিজেও হতাশ। বদলির যে নিয়ম চালু রয়েছে, এটা রদবদল জরুরি হয়ে পড়েছে। এটা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা