kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

হর্নে ‘বধির’ মেহেরপুর

শহরে শব্দদূষণ, আইনে সাজার ব্যবস্থা

ইয়াদুল মোমিন, মেহেরপুর   

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হর্নে ‘বধির’ মেহেরপুর

মেহেরপুর শহরে অ্যাম্বুল্যান্স, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের গাড়ির হর্ন ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক, লেগুনা, নছিমন-করিমন, মোটর সাইকেল বা প্রাইভেট কারে ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে শব্দদূষণ ঘটে। যা সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ আনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সরেজমিনে শহরের ড. শহীদ সামসুজ্জোহা পার্কের সামনের প্রধান সড়কে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও শহরসহ জেলাজুড়ে উচ্চ শব্দে হর্ন বাজানো হচ্ছে। এমনকি সরকারি যানবাহনেও নিয়ম মেনে হর্ন ব্যবহার হচ্ছে না। যার যার ইচ্ছামতো গাড়িতে হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহার করছে। আর হর্নের বিকট শব্দে অতিষ্ঠ লাখ লাখ মানুষ। ফলে ছোট-বড় সবার শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এসব হর্ন বাজিয়ে দ্রুতগতিতে চলছে ছোট ছোট যানবাহন। কেউ পথ না ছাড়লে তাকে দেওয়া হয় হুমকি-ধমকি। দ্রুতগতিতে শহরের মধ্যে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে পুলিশ বা প্রশাসন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত মেহেরাব হোসেন হোটেল বাজার থেকে মহিলা কলেজ মোড়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর মোটরসাইকেলে ট্রাকের হর্ন লাগিয়েছেন। তাই বাজিয়ে সামনে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সামনে থেকে বোঝার উপায় ছিল না মোটরসাইকেলের হর্ন বাজানো হচ্ছে, নাকি মালবাহী ট্রাকের। তাঁর সামনে থাকা বেশির ভাগ ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক, মোটরসাইকেল পেছনে ট্রাক মনে করে তাঁকে পথ দিচ্ছিল।

শহরের নগর উদ্যানের সামনে জানতে চাইলে মেহেরাব বলেন, ‘রাস্তায় যানজট লেগেই আছে। তাই ট্রাকের হর্ন লাগিয়েছি, যাতে সহজে বের হওয়া যায়। এ হর্ন শুনলে সামনের মানুষ ও যানবাহন পথ ছেড়ে দেয়।’

রাতের নীরবতাকেও ফালা ফালা করে ঢুকে পড়ছে মোটরসাইকেলে লাগানো ট্রাকের হর্ন, অ্যাম্বুল্যান্স ও পুলিশের গাড়ির সাইরেন। কেউ কেউ আবার মোটরসাইকেলে ফায়ার সার্ভিসের সাইরেন লাগিয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ এই হর্ন বা সাইরেন ব্যবহার করছে বেশি। তারা শব্দদূষণের কোনো সময়সীমা মানছে না। আইন অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকার নির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এসব জায়গায় জোরে হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকলেও সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না।

মেহেরপুর সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল আমিন জানান, মেহেরপুর শহরের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সড়কের পাশে। ফলে যানবাহনের উচ্চ শব্দে হর্ন বা সাইরেন বাজানোর কারণে তাত্ক্ষণিকভাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট হয়। লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটে।

মেহেরপুর ছহিউদ্দিন ডিগ্রি কলেজের পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাসুদ রেজা জানান, শহরের মধ্যে কোনোভাবে যানবাহনের হর্ন বাজানো উচিত নয়। উচ্চ শব্দে হর্ন বাজানোর কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কেন এটা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না, তা দুঃখজনক।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা সজিব উদ্দীন স্বাধীন জানান, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী কোনো এলাকায় ৬০ ডেসিবেল মাত্রার বেশি শব্দ হলে সেই এলাকা দূষণের আওতায় চিহ্নিত হবে। ৬০ ডেসিবেল শব্দ মানুষের সাময়িক শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে এবং ১০০ ডেসিবেল শব্দ চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে। বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

মেহেরপুর জেলা মোটরযান পরিদর্শক সালাউদ্দীন প্রিন্স জানান, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুল্যান্সের নিজ নিজ শব্দের সতর্কসংকেত আছে। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর ৪৫ নম্বর ধারায় উল্লেখ রয়েছে, নীরব এলাকায় হর্ন বাজানো যাবে না। আর ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা অ্যাম্বুল্যান্সের সতর্কসংকেত যন্ত্র অন্য কোনো যানবাহনেও ব্যবহার করা যাবে না। এই বিধান লঙ্ঘন করলে ৮৮ নম্বর ধারায় উল্লেখ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তিন মাসের জেল, ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় শাস্তি এবং চালকের এক পয়েন্ট কাটা যাবে।

মেহেরপুরের পুলিশ সুপার এস এম মুরাদ আলী বলেন, ‘পুলিশ, অ্যাম্বুল্যান্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির সাইরেন অন্য কোনো গাড়িতে লাগানো বা বাজানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গাড়ির কাগজপত্র ও ফিটনেসের পাশাপাশি সাইরেন বা হর্ন বাজানো বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক মো. আতাউল গণি বলেন, কিছু উঠতি যুবক এসব হর্ন বাজিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে মোটর বাইক চালায়। এটাও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে উচ্চ শব্দের হর্ন বন্ধ করতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা