kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

হাইকোর্ট ও মন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা

হবিগঞ্জে ফের টিলা কাটা শুরু

আলমগীর মিয়া, নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ)   

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হবিগঞ্জে ফের টিলা কাটা শুরু

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে ফের টিলা কাটা শুরু হয়েছে। কিছুদিন আগে বনমন্ত্রী টিলা কাটা বন্ধের নির্দেশ দিলে প্রশাসন তৎপর হয়। কাটাকাটি বন্ধও ছিল। এখন প্রশাসন গা ছেড়ে দেওয়ায় আগের চক্রটি ফের সক্রিয় হয়েছে।

এলাকাবাসী জানায়, একসময় পাখির ডাকে মুখর থাকত এই উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চল। বন্য বানরের জন্য পরিচিত ছিল এই এলাকা। জঙ্গল উজাড় ও টিলা কাটায় পশুপাখির বিচরণ দূরের কথা, প্রাকৃতিক ভারসাম্যই ঠিক রাখা যাচ্ছে না। এই অঞ্চলের পাহাড় কাটা নিয়ে ২০১৫ সালের ২২ আগস্ট কালের কণ্ঠ ‘পাহাড় কাটা থামছে না’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দিনারপুরের সবচেয়ে বড় পাহাড় মিরের টিলা কাটা হচ্ছে। এই প্রতিবেদন যুক্ত করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারিপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের বেঞ্চ রায় দেন। তাঁরা দিনারপুরের সব পাহাড় ও টিলা সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। এরপর পাহাড় কাটা বন্ধ হয়। কিছুদিন পর আবার পাহাড় কাটা শুরু হয়। ২০১৮ সালের ২১ মার্চ কালের কণ্ঠে ‘দিনারপুরে দিনদুপুরে চলছে পাহাড় কাটা’ শিরোনামে এবং ‘মানা হচ্ছে না হাইকোর্টের নির্দেশও’ উপশিরোনামে একটি ফলো আপ প্রতিবেদন ছবিসহ ছাপা হয়। এরপর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন পাহাড় কাটা চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) সুলতান আহমেদকে নির্দেশ দেন। তদারকি শুরু করে স্থানীয় ভূমি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তর। আবার পাহাড় কাটা বন্ধ হয়। কিন্তু প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি না থাকায় সম্প্রতি অবৈধভাবে পাহাড় কাটা শুরু হয়েছে। এবার কাটা হচ্ছে উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের লামরোহ, সাতাইহাল, গজনাইপুর, মামদপুরে। ফলে শত বছরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এলাকার পরিবেশ, মাটি, পানি ও প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সেই সঙ্গে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সবুজ বনভূমি।

আইন অনুযায়ী, বিনা অনুমতিতে পাহাড় কাটলে সর্বোচ্চ দুই বছরের জেল কিংবা দই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তি হতে পারে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল কিংবা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তি হতে পারে।

সম্প্রতি লামরোহতে গেলে স্থানীয়রা জানায়, গজনাইপুর ইউনিয়নের লামরোহ গ্রামের খলিল মিয়ার ছেলে জয়নাল মিয়ার টিলা কিছুদিন ধরে কাটা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ইমদাদুর রহমান মুকুলের নির্দেশে কুতুব মিয়া কাটছেন। এ ছাড়া সাতাইহাল গ্রামের যুবলীগ নেতা বলে পরিচিত নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে চার-পাঁচজন টিলা কেটে মাটি বিক্রি করছে। অন্যদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে সাতাইহাল গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বাড়ির প্রবেশপথে উঁচু একটি টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে। এটি কাটছেন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য তোয়াব মিয়া। টিলা কেটে সমতল করে বড় বাড়ি নির্মাণের জন্য এমন কর্মকাণ্ড করছেন বলে এলাকার লোকজন জানিয়েছে। এ ছাড়া গজনাইপুর, মামদপুরে টিলার মাটি কাটা শুরু হয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, পরিবেশ বিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জোরালো কোনো ভূমিকা নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। এসব স্থানে দিনে, আবার কোনো সময় রাতের আঁধারে পাহাড় কেটে দিনের বেলায় ট্রাকে করে মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়। অনেক জায়গায় যন্ত্র দিয়ে টিলা কাটা হলেও প্রশাসন যেন নির্বিকার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘প্রভাবশালীদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় বিরামহীনভাবে টিলা কাটা হচ্ছে প্রশাসনের চোখের সামনে। এই অঞ্চলের এলাকাজুড়ে টিলা কেটে গড়ে তোলা হয়েছে অনেক স্থাপনা।’

পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত কুতুব মিয়া বলেন, ‘চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুলের নির্দেশে আমি পাহাড় কেটে মাটি নিয়ে সড়ক নির্মাণকাজে ব্যবহার করছি।’

গজনাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইমদাদুর রহমান মুকুল বলেন, ‘পাহাড় কাটার বিষয়ে আমি জানি না। কোথাও পাহাড় কাটা হয় বলেও আমি জানি না।’

নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদ-বিন হাসান বলেন, ‘পাহাড় কাটার বিষয়টি আমি শুনেছি। ইতিমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানিয়েছি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ মিলাদ বলেন, ‘যারা পাহাড় কাটছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা