kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

টার্কির ‘ফাঁদে’ নিঃস্ব খামারিরা

রংপুরে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দরজায় ঝুলছে তালা

সীমান্ত সাথী, রংপুর   

২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টার্কির ‘ফাঁদে’ নিঃস্ব খামারিরা

রংপুরে প্রলোভনে পড়ে টার্কির খামার করে দেউলিয়া হয়েছেন শত শত ব্যক্তি। টাকা উদ্ধারে খামারিরা দিনের পর দিন টার্কি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কিন্তু ব্যবসায় ধস দেখে তিন মাস আগে অফিসে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে ওই প্রতিষ্ঠান। 

ভুক্তভোগী খামারি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রংপুর অঞ্চলে অক্টালিংক অ্যাগ্রো লিমিটেড নামের একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় দেড় বছর আগে টার্কি ব্যবসা শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্রধান কার্যালয় রংপুর শহরের গণেশপুর সড়কে। আর ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মওদুদা আক্তার দিনা। রংপুরে ৯৩৪ জন খামারি দিয়ে ব্যবসা শুরু করে তারা। এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে একজন ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়। এতে শুধু রংপুরেই কর্মরত ৩৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। নতুন এ ব্যবসায় প্রথম দিকে লাভের মুখ দেখে তারা। আর তাদের প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে লোভ সামলাতে না পেরে অনেক বেকার যুবক ও ব্যবসায়ী এ খামার ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু বাজারে টার্কির চাহিদা না থাকা, ভাইরাসে আক্রান্ত, খাদ্যের দাম, বাজারজাত করতে না পারায় দিনে দিনে ওই ব্যবসায় ধস নামতে থাকে।

এদিকে অক্টালিংক অ্যাগ্রো খামারিদের প্রতিশ্রুতি দেয়, টার্কি পালনে লাভ বেশি। অল্প সময়ে অধিক মুনাফা। আবার টার্কি কোনো রোগে মারা গেলে বদলি দেওয়া হয়। বিনা মূল্যে দেওয়া হবে সব ভ্যাকসিন। এমনকি ওষুধ সরবরাহ, চিকিৎসা ও পরামর্শসেবা দেওয়ার কথা বলে খামারিদের। আবার ৯০ দিনের মধ্যে খামারের সব টার্কি বাজারদর অনুযায়ী কেনা হবে—এমন চুক্তিও করা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। খামারিদের ফাঁদে ফেলে অবকাঠামো (শেড) নির্মাণ করে টার্কি সরবরাহ করা হয়। পরে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অক্টালিংক খামারিদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্যদিকে প্রতিদিনের খাদ্য সরবরাহ করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন খামারিরা। 

টার্কি পালনে আগ্রহী খামারিদের ঋণ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নীতিমালা প্রকাশ করে। ওই নীতিমালায় বলা হয়, এক দিন বয়সের টার্কির বাচ্চা কিনে পালনের জন্য ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ পাওয়া যাবে। তবে ঋণ নিতে হলে খামারির নিজস্ব জমি থাকতে হবে এবং সেখানে শেড নির্মাণ করতে হবে। এক হাজার টার্কি পালনে ব্যাংক সর্বোচ্চ ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে।

খামারিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ও পল্লী ঋণের নতুন নীতিমালায় টার্কি পালনে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পায়নি বলে অভিযোগ। ফলে এ খামার ব্যবসায় আরো ধস নামে।

রংপুরের বদরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের মিরাপাড়ার খামারি জাহেদুল হক (৫০)। তিনি ৪২০টি টার্কির একটি প্যাকেজ নেন পাঁচ লাখ ১০ হাজার টাকায়। চুক্তি করা হয়, ৯০ থেকে ৯৭ দিনের মধ্যে টার্কির বয়স পূর্ণ হলে অক্টালিংক অ্যাগ্রো লাভসহ ওই সময়ের বাজারদর অনুযায়ী টার্কিগুলো কিনে নেবে। সে হিসাবে তাঁকে একটি ব্যাংকের চেকও দেওয়া হয়। এর মধ্যে তাঁর কাছ থেকে ২০০ টার্কি নিয়েও যায় ওই প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় দফায় তাঁর খামার থেকে টার্কি নিতে গেলে ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা চান তিনি। কিন্তু তারা টালবাহানা শুরু করে। এতে জাহেদুলের সন্দেহ হলে তিনি টার্কিবাহী একটি পিকআপ ভ্যান আটক করেন। গত ২৫ জুলাই থেকে ভ্যানটি খামারেই পড়ে আছে। এর পরও ওই প্রতিষ্ঠান তাঁকে টাকা দিচ্ছে না, এমনকি গাড়িও নিচ্ছে না।

ক্ষতিগ্রস্ত খামারি জাহেদুলের অভিযোগ, ‘রংপুর ইউনিয়ন ব্যাংক শাখায় চেক দিয়ে টাকা তুলতে গিয়ে দেখি অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। টার্কির খামার করতে গিয়ে আমার ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এখন আমি পথে বসার অবস্থা। আমার মতো অনেকেই এখন নিঃস্ব। তারা (অক্টালিংক) প্রথমে অনেক লোভনীয় অফার দেয়। কিন্তু পরে সটকে পড়ে। উপায় না দেখে আদালতে চেক ডিস-অনার মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

জাহেদুলের চেয়ে আরো খারাপ অবস্থা আরেক খামারি আব্দুর রাজ্জাকের। রংপুর সদরের মমিনপুর এলাকায় বিশাল জায়গাজুড়ে খামার করেছেন তিনি। অক্টালিংকের কাছে ১৫ লাখ সাত হাজার ৫৯০ টাকা পাবেন বলে দাবি করেছেন এ খামারি। কিন্তু প্রতিদিন ধরনা দিয়েও কারো দেখা পাচ্ছেন না।

খামারি মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রতিদিন একেকটি টার্কির পেছনে ২০ টাকার খাদ্য দরকার। অথচ সেই পরিমাণ লাভ হয় না।’  

একই অবস্থা বদরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র উত্তম সাহারও। তিনিও একটি বিশাল শেড নির্মাণ করে পৌর শহরের  লিচুবাগান এলাকায় টার্কির খামার করেন। কিন্তু চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকায় ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

অক্টালিংকের মাঠকর্মী গোলাম রব্বানী রনি বলেন, ‘বিদেশে রপ্তানি করতে না পারার কারণে এ ব্যবসায় ধস নেমেছে।’

এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে অক্টালিংক অ্যাগ্রোর চেয়ারম্যান মওদুদা আক্তারের মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে অফিস বন্ধ করে দেওয়ার কথা স্বীকার করে অক্টালিংক অ্যাগ্রোর চিফ সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং অফিসার শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, ‘ব্যাংকঋণের সুবিধা না পাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে কম্পানি।’ 

বদরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ওমর ফারুক বলেন, ‘একটি চক্র ডেসটিনির মতো ফাঁদ পেতে সহজ-সরল মানুষকে বোকা বানিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।’ একই ধরনের কথা বলেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. শাহ জালাল খন্দকার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা