kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ আষাঢ় ১৪২৭। ৯ জুলাই ২০২০। ১৭ জিলকদ ১৪৪১

তিন ফসলি জমিতে ইটভাটার থাবা

সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাগুরার চার উপজেলার তিন ফসলি জমি ও নদী দখল করে ৬০টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে

শামীম খান, মাগুরা   

২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তিন ফসলি জমিতে ইটভাটার থাবা

মাগুরা সদরের লস্করপুর গ্রামের গোলজার শেখের মাত্র এক বিঘা ফসলি জমি রয়েছে। এই জমিটুকুতে তিন ফসল আবাদ করে চলে তাঁর সংসার। পাশেই স্থানীয় ভিটাসাইর গ্রামের আওয়াল মোল্লা ইটভাটা করছেন। এই ভাটার প্রয়োজনে এখন গোলজার শেখের জমির ওপর তাঁর নজর পড়েছে। গোলজার শেখকে নানাভাবে চাপ দিচ্ছেন তাঁর জমি ভাটার কাজে ব্যবহারের জন্য। একই অবস্থার শিকার হচ্ছেন ওই গ্রামের মোহাম্মদ শেখ, আবুল কাশেমসহ অনেকে। ইটভাটায় জমি হারানোর ভয়ে শঙ্কিত সবাই।

সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাগুরার চার উপজেলার তিন ফসলি জমি ও নদী দখল করে অন্তত ৬০টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। তাতে একদিকে কৃষি জমির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে এলাকার মানুষ। ভেঙে যাচ্ছে মধুমতি নদী।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র মতে, মাগুরা সদর, মহম্মদপুর, শ্রীপুর ও শালিখা এ চার উপজেলায় ইটভাটার সংখ্যা ৯০টি। এগুলোর মধ্যে অন্তত ৬০টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে তিন ফসলি জমি ও মধুমতি নদী দখল করে। মাগুরা সদর উপজেলার জগদল, লস্করপুর, চাঁদপুর, পারলা, আঠারোখাদা, কাশিনাথপুর, ছোটব্রিজ, ইটখোলা, আমুড়িয়া, ধলহারা, ইছাখাদা; মহম্মদপুরের তল্লাবাড়িয়া, ধোয়াইল, কানুটিয়া; শ্রীপুরের উপজেলা সদর ও বাখেরা; শালিখার আড়পাড়া, শতখালী, হরিশপুর, বুনাগাতিসহ বিভিন্ন মাঠে তিন ফসলি জমিতে অন্তত ৩০টি ইটভাটা গড়ে তোলার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সদর উপজেলার বাগবাড়িয়া, কুছুন্দি, পাতুড়িয়া এলাকার মধুমতি নদী দখল করে একই জায়গায় গড়ে উঠেছে অন্তত ৩০টি ইটভাটা।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জেলায় মোট ৯০টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র ১০টির লাইসেন্স আছে। বাকি ৮০টি ইটভাটা অনুমোদন ছাড়াই চলছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায়ই এসব ইটভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা আদায় করা হয়। কিন্তু ভাটাগুলোতে ইট পোড়ানো বন্ধ হয়নি। তা ছাড়া বেশির ভাগ ভাটায় সিমেন্টের তৈরি ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের চিমনির বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে স্বল্প উচ্চতার চিমনি, যা আইনত নিষিদ্ধ।

ভাটা সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে, জেলার প্রতিটি ভাটায় মৌসুমজুড়ে গড়ে ৫০ লাখ ইট পোড়া হয়। প্রতি এক লাখ ইটে ৮০ টন থেকে ১০০ টন হিসাবে ৯০টি ইটভাটায় প্রয়োজন প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি কাঠ। টনপ্রতি আড়াই হাজার টাকা হিসাবে যার মূল্য অন্তত শত কোটি টাকা। যা সংগৃহীত হয় জেলার বিভিন্ন বন ও বাঁশবাগান থেকে।

ফসলি জমিতে নতুন নতুন ইটভাটা গড়ে ওঠার বিষয়ে সদর উপজেলার জগদল ইউনিয়নের লস্করপুর গ্রামের কৃষক আবুল কাশেম, বাচ্চু মিয়া, গোলজার শেখ, মোহাম্মদ শেখসহ ভুক্তভোগীরা জানান, লস্করপুর মাঠে তিন ফসলি জমিতে ফাতেমা ব্রিকস নামের ইটভাটা করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে অনুমোদনের আবেদন করেছেন সদরের ভিটাসাইর গ্রামের আওয়াল মোল্লা। ইতিমধ্যে মাগুরা সদর কৃষি অফিসের অনুমতি নিয়েছেন তিনি। আওয়াল মোল্লা কৃষকদের জানিয়ে দিয়েছেন, চলতি ফসল উঠে গেলে যেন নতুন করে কেউ ফসল আবাদ না করেন। অথচ এই জমির ফসলেই তাঁদের সংসার চলে। নামমাত্র ইজারার মাধ্যমে জোর করে এসব জমি লিজ নিয়ে ইটভাটা করলে তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। পাশাপাশি এলাকার পরিবেশ দূষিত হবে। আশপাশের জমিগুলো নষ্ট হবে। ভুক্তভোগীরা এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছেন।

মাগুরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাহিদুল আমিন বলেন, ‘ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রেজল্যুশনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। তিন ফসলি জমিতে কোনো কারখানা বা ইটভাটা করা যাবে না। বিষয়টি জেলার প্রতিটি ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের জানানো হয়েছে।

মাগুরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিন ফসলি জমিতে যাতে কোনো ইটভাটা গড়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তা ছাড়া অবৈধ ইটভাটার বিষয়েও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা