kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

মেয়াদ শেষ, কাজ ঝুলছে

কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প ব্যয় ২৪ কোটি টাকা ♦ শ্রমিকের মজুরিতে ফাঁকি

কপিল ঘোষ, চিতলমারী-কচুয়া (বাগেরহাট)   

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মেয়াদ শেষ, কাজ ঝুলছে

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় সরকারি আবাসিক কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের নকশা এবং বাস্তব অবস্থা (ওপরে)। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রায় ২৪ কোটি টাকার প্রকল্প। তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ হয়নি। এদিকে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের নিয়মিত মজুরি দিচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় সরকারি আবাসিক কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণে এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৪০টি উপজেলায় ৪০টি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প শিরোনামে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর আওতায় এ কাজ চলছে। এটি জেলার একমাত্র সরকারি আবাসিক কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। কেন্দ্রটি চালু হলে শিক্ষার্থীদের আর খুলনা ও ঢাকা ছুটতে হবে না। দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও বেকারত্ব দূর করতে এ কেন্দ্র অন্যতম ভূমিকা পালন করবে—এমনটা আশা করছে চিতলমারীবাসী।

গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শ্যামপাড়া গ্রামে দেড় একর জমিতে এ প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ৪৯ লাখ আট হাজার ৪৪৯ টাকায় দেড় একর জমি অধিগ্রহণ করে জেলা প্রশাসন। ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট ওই জায়গা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে গণপূর্ত বিভাগ দরপত্র আহ্বান করলে নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ছয়তলা একাডেমিক ভবন, ডরমিটরি, অধ্যক্ষের বাসভবনসহ বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, পাম্প হাউস, গ্যারেজ, ডিপ টিউবওয়েল, আরসিসি সড়ক, সীমানাপ্রাচীর ও ফটক নির্মাণকাজ পর্যায়ক্রমে চলছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। কম্পিউটার অপারেশন, গ্রাফিক্স, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস, মেশিন টুলস অপারেশন, রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনার ও অটো ড্রাইভিং কোর্স এই সাতটি ট্রেডে তিন ও ছয় মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পরে পর্যায়ক্রমে যুক্ত করা হবে এসএসসি (ভোকেশনাল) কার্যক্রমসহ আরো ট্রেড।

অবহেলিত চিতলমারী উপজেলায় এই প্রথম এমন বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ভীষণ খুশি স্থানীয় লোকজন। যে গ্রামে প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে সেই শ্যামপাড়া গ্রামের গার্মেন্টকর্মী বাবলু মণ্ডল বলেন, ‘বর্তমানে কেউ কারিগরি প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে তাকে খুলনা বা ঢাকা যেতে হয়। কিন্তু এখানে প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি চালু হলে স্থানীয় বেকাররা সহজেই আত্মকর্মসংস্থানের দিশা খুঁজে পাবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, একাডেমিক ভবন নির্মাণে সংশ্লিষ্ট ঢালী কনস্ট্রাকশনের শ্রমিকরা স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে জ্বালানিসহ নানা উপকরণ নিচ্ছে।

চিতলমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অশোক কুমার বড়াল বলেন, দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এ প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি চিতলমারীসহ বাগেরহাট অঞ্চলের যুবসমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। বেকাররা নিজেদের দক্ষ করে তুলতে পারবে।

গত শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের দৃশ্যমান সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। তাঁর তথ্যানুযায়ী, প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষের ছয়তলা ভিতবিশিষ্ট চারতলা বাসভবন। এর নির্মাণ ব্যয় প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ ৫৮ হাজার ৯২৪ টাকা। কাজ করছে পটুয়াখালীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মহিউদ্দিন আহম্মেদ। মেয়াদ ছিল চলতি বছরের ১৩ জুন পর্যন্ত। এ ভবনের দক্ষিণে ছয়তলা ভিতবিশিষ্ট তিনতলা ছাত্রাবাস নির্মাণ করছে খুলনার মেসার্স জয় এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড এমবি প্রাইভেট লিমিটেড। প্রায় তিন কোটি ৯৮ লাখ ৭৮ হাজার ৩০২ টাকা ব্যয়ে নির্মাণের কার্যাদেশ হয় ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর। পরবর্তী ১৫ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু হয়নি। একাডেমিক ভবন প্রায় ১০ কোটি ৫৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫২ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করছে ঢাকার ঢালী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। ২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কার্যাদেশ পায় এবং ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক জানান, ১২ জন শ্রমিক ছাদ ঢালাইয়ের কাজ করছেন। দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি দেওয়ার কথা। কিন্তু তাঁদের দেওয়া হচ্ছে ২০০ টাকা। এক মাস ধরে এমনটা করা হচ্ছে। ঢালাই শেষে বাকি টাকা দেওয়ার কথা বলেছেন ঠিকাদার। এর মাধ্যমে মূলত তাঁদের শ্রমে বাধ্য করা হচ্ছে, যা শ্রম আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এ বিষয়ে ঢালী কনস্ট্রাকশনের স্থানীয় প্রকৌশলী মো. মশিউর রহমান জানান, এ জমির ওপর দিয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক লাইন সরানো ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ হয়েছে। কাজ সমাপ্তির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য গণপূর্ত বিভাগে আবেদন করা হয়েছে। শ্রমিকরা যাতে দেনাগ্রস্ত হয়ে না পড়েন সে বিষয়টি দেখা হবে।

গণপূর্ত বিভাগ বাগেরহাটের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম বলেন, ‘২৪ কোটি সাত লাখ ৭৭ হাজার টাকা ব্যয়ে এ প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি নির্মাণের কাজ চলছে। কাজের প্রধান তিনটি ভবন নির্মাণ করছে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কেন্দ্রের চারপাশের প্রাচীর, ফটক, ভেতরের রাস্তা, পানির ট্যাংকসহ সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ পর্যায়ক্রমে হবে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ঠিকাদার আবেদন করেছেন। আশা করছি ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হবে এবং ২০২০ সালের জুনের মধ্যে কেন্দ্রটি চালু হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা