kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

ঘোড়ার দাপটে ডুবল নৌকা

মেহেন্দীগঞ্জে জামানত বাজেয়াপ্ত আওয়ামী লীগ প্রার্থীর

আজিম হোসেন, বরিশাল   

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



২০১৪ সালে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে এক লাখ ৯ হাজার ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট মুনসুর আহমেদ। সে সময় তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীকের রফিকুল ইসলাম লাবু পেয়েছিলেন মাত্র ৯ হাজার ভোট। লাবুর চেয়ে ১২ গুণ ভোট বেশি পেয়েছিলেন মুনসুর। তবে গত সোমবার অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে পুরো উল্টো চিত্র।

এবারের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী ছিলেন মুনসুর (নৌকা)। কিন্তু এ বছর মাত্র এক হাজার ৭৫৭ ভোট পেয়েছেন তিনি। আর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাহফুজ আলম লিটন পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৪৫৯ ভোট, যা মুনসুরের চেয়ে ২১ গুণ বেশি। এ ছাড়া এবারের নির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে চতুর্থ হয়ে জামানতও হারিয়েছেন নৌকার মুনসুর। তাঁর এমন শোচনীয় পরাজয়ে জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) পংকজ দেবনাথকে দায়ী করছে। তাদের অভিযোগ, এমপি পংকজ ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কেন্দ্র দখল করেছেন, এজেন্টদের বের করে দিয়েছেন এবং ভোট কারচুপি করে নৌকাকে হারিয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগ তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রে অভিযোগও করেছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস অভিযোগ করেন, ‘স্থানীয় এমপি পংকজ দেবনাথ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ঘোড়া প্রতীকের পক্ষে কাজ করেছেন। তিনি নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে পরাজিত করতে সব ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। নইলে নৌকা প্রতীকের এমন দুরবস্থা হয়নি যে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।’

তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘গত নির্বাচনে ৬৫ শতাংশের বেশি ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এবার তার অর্ধেক ভোটারও ভোট দেননি। এর কারণ স্থানীয় এমপি পংকজ দেবনাথ তাঁর অনুসারীকে বিজয়ী করতে প্রভাব বিস্তার করায় ভোটাররা ভয়ে কেন্দ্রে আসেননি। আমরা এমপির বিষয়ে কেন্দ্রকে জানিয়েছি। নৌকার পরাজয় ও ভরাডুবিতে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, তাও কেন্দ্রকে জানিয়েছি। এখন কেন্দ্রই পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।’

অন্যদিকে নৌকার প্রার্থী মুনসুরের অভিযোগ, ‘স্থানীয় এমপি স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে আন্দারমানিক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃৃত সভাপতি মাহফুজকে স্বতন্ত্র প্রার্থী করেছেন। এ প্রার্থীর সব নির্বাচনী প্রচারণা ও দেখভাল করেছেন এমপির চাচাতো ভাই উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক রাম দেবনাথ এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম। এমপির নির্দেশে ও তাঁদের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নৌকার বিরুদ্ধে গিয়ে ঘোড়া প্রতীকের পক্ষে কাজ করেছেন।’ এ সময় তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘সোমবার ভোট শুরু হলে এমপি পংকজ নাথের কর্মীরা সব কেন্দ্র দখল করে নেন। তাঁদের কর্মীদের ছাড়া সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। যাঁরা কেন্দ্রে গেছেন তাঁদের আঙুলের ছাপ দেওয়ার পর প্রতীকের বোতামে চাপ দিয়ে ভোট সম্পন্ন করেছেন ঘোড়া প্রতীকের কর্মীরা। ভয়ে নৌকার পোলিং এজেন্টরা কেন্দ্রে যাননি।’

একই অভিযোগ করেন বিএনপি সমর্থিত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী গোলাম ওয়াহিদ হারুন। তিনি বলেন, (সোমবার) সকালে ভোট শুরুর আগে তাঁর পোলিং এজেন্টরা কেন্দ্রে ঢুকতে গেলে তাঁদের বাধা দেন ঘোড়া প্রতীকের কর্মীরা। কোনো কোনো কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট ঢোকার পর বের করে দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার নুরুল আলম বলেন, ভোট খুব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলার অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

তিনি আরো বলেন, ‘৯৯ কেন্দ্রের সবগুলোতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ করা হয়। মোট দুই লাখ ১৮ হাজার ৬১৬ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪৫ হাজার ৭৫৭ জন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে মাহফুজ আলম লিটন (ঘোড়া) পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৪৫৯ ভোট, তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির হানিফ মিয়া (লাঙল) পেয়েছেন তিন হাজার ৪০ ভোট, বিএনপির ওয়াহিদ হারুন (ধানের শীষ) দুই হাজার ১৪৩ ভোট ও আওয়ামী লীগের মুনসুর আহমেদ (নৌকা) এক হাজার ৭৫৭ ভোট পেয়েছেন। ভোটাররা যে প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন তিনিই বিজয়ী হয়েছেন।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বরিশাল-৪ আসনের (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) এমপি পংকজ দেবনাথ। তাঁর দাবি, ‘মুনসুর আহমেদ ভোটই করেননি। তিনি নির্বাচনী মাঠে ছিলেন না। বরিশালে থেকেই প্রার্থী হয়েছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভোট নিয়ে কোনো যোগাযোগই করেননি। তাই বিশাল ভোটের ব্যবধানে তাঁর পরাজয় হয়েছে।’ এমপির অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে হেয় করতেই জেলা আওয়ামী লীগ তাঁর বিরুদ্ধে এ অপপ্রচার চালাচ্ছে। নৌকা প্রতীকের ‘সঠিক’ প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলে ভোটের ফলাফল এমন হতো না বলে দাবি করেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা