kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৭ রবিউস সানি ১৪৪১     

নাটোরে জমি নিবন্ধনে শুভংকরের ফাঁকি

দলিল লেখকচক্রের লোভ, সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব

নাটোর প্রতিনিধি   

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জমির অবস্থান নাটোর পৌর শহরের আমহাটি মৌজা। দাম এক কোটি ৩০ লাখ টাকা। সরকারি রাজস্ব প্রায় ২৫ লাখ টাকা। সেই জমি দলিলে ছাতনী ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে। ২০ লাখ টাকায় নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) করা হয়েছে। রাজস্ব দেওয়া হয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। বাকি রাজস্ব সরকার হারালেও নাটোরের দলিল লেখকচক্র লাভবান হয়েছে।

সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোটি টাকার জমি নামমাত্র মূল্যে দলিল তৈরি করায় বিক্রেতা ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম নাটোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে জানা গেছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর সদর সাবরেজিস্ট্রার অফিসে পৌর শহরের আমহার্টির ৮১ শতাংশের একটি জমি রেজিস্ট্রি হয়। পৌরসভাধীন প্রতি শতাংশ পুকুরের জমির সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা আছে এক লাখ ৫৬ হাজার ৯০৫ টাকা। কিন্তু ক্রেতা কান্দিভিটুয়ার আবুল হোসেনের ছেলে বিসমিল্লাহ বস্ত্রালয়ের মালিক শাহজাহান সরদার দলিল লেখকের সঙ্গে যোগসাজশ করেন। ইউনিয়নের জায়গা দেখিয়ে মাত্র ২০ লাখ টাকায় রেজিস্ট্রি করেন। প্রকৃতপক্ষে পুকুরটি নাটোর পৌর এলাকার অন্তর্ভুক্ত। বিক্রেতা আব্দুস সালাম এক কোটি ৩০ লাখ টাকা বুঝে পেয়ে সরল মনে দলিলে স্বাক্ষর করেন। পরে দলিলের নকল তুলে তিনি দেখতে পান ২০ লাখ টাকায় দলিল সম্পাদন করা হয়েছে।

ব্যক্তিগত আয়কর দেওয়ার ক্ষেত্রে বিড়ম্বনার হাত থেকে রক্ষা পেতে তিনি ক্রেতার নিকট থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য চলতি বছরের ২০ সেপ্টেস্বর নাটোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বরাবর অভিযোগ করেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এর অনুলিপি জেলা প্রশাসক, রেজিস্ট্রার, সাবরেজিস্ট্রার নাটোর সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর পাঠান হয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে ক্রেতা শাহজাহান সরদার বলেন, ‘নিয়ম মেনেই জমিটি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। তিনি যখন জমিটি বায়নানামা করেন তখন জমিটি পৌরসভার বাইরে ছিল। পরে পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিষয়টি নিয়ে দলিল লেখক এবং বিক্রেতা আব্দুস সালামের সঙ্গে আলোচনা করেই জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। এখন কেন তিনি অভিযোগ করছেন তা আমার কাছে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।’

এ বিষয়ে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোছা. শরীফুন্নেছা বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চক্রের সক্রিয়তা

স্থানীয়দের অভিযোগ, নাটোর সদর সাবরেজিস্ট্রার অফিসে দীর্ঘদিন ধরে দলিল লেখক সমিতির কয়েকজন নেতা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে জমি নিবন্ধন করছেন। এক্ষেত্রে জমির শ্রেণি পরির্বতন করে দাম কম দেখানো হয়। ক্রেতাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে দোলা ডাঙ্গা জমিকে বাঁশঝাড়, ভিটা ও ডোবা দেখান হয়। এ ছাড়া নিবন্ধনের সময় বিক্রীত জমির ভুয়া মাঠ পরচা, খাজনার রসিদ, খারিজের কাগজপত্র দেখান হয়। এসবই করছে দলিল লেখক সমিতির একটি চক্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দলিল লেখক জানান, ২০১৭ সাল থেকে অদ্যাবধি চক্রটি ঘুষের বিনিময়ে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে নিবন্ধন করে আসছে। এতে করে সরকার দুই বছরে অন্তত কয়েক শ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাঁরা জানান, শুধু ২০১৯ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রেজিস্ট্রি হওয়া দলিলগুলো বের করে তদন্ত করলেই চক্রটির অনিয়ম ধরা পড়বে।

নাটোর দলিল লেখক সমিতির সভাপতি হেলাল জোয়ারদার অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের কোনো চক্র নেই।’

এ ব্যাপারে সদর সাবরেজিস্ট্রার অসিম কুমার বণিক বলেন, ‘দলিল না দেখে কিছু বলা সম্ভব নয়। আমি যোগদানের পর থেকে সরকারি রাজস্ব যাতে ফাঁকি না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা