kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

মারদাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান

আহসান হাবিব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মারদাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান

ফয়েজ উদ্দীন

ইউনিয়ন পরিষদকে (ইউপি) বানিয়েছিলেন টর্চার সেল (নির্যাতন কেন্দ্র)। সরকারি জমিতে পরিষদ থাকলেও ক্ষমতার দাপটে পারিবারিক জমিতে তা স্থানান্তর করেন। মাদক, অস্ত্র ও জাল টাকার কারবারসহ ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ করতেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীনের বিরুদ্ধে এমন বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পদ্মা নদীসংলগ্ন বেড়িবাঁধ এলাকায় তৈরি করেছেন ডেরা। এখান থেকে তিনি পরিচালনা করতেন তাঁর সব অবৈধ কর্মকাণ্ড। এ ছাড়া এটি মাদক সেবনের আখড়া বলেও জানিয়েছে এলাকাবাসী। বেড়িবাঁধের এ জায়টিকে চোরাচালানের ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। করতেন ভারতীয় গরুর ব্যবসা। পাচারকারীদের কাছ থেকে ছিনতাই করে আনা গবাদি পশু বৈধ করার জন্য বসান অবৈধ পশুর হাট।

গত বুধবার রাতে রুবেল হোসেন নামের এক যুবকের দুই হাতের কবজি কেটে বিচ্ছিন্ন কারার অভিযোগে ফয়েজ উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। গত শুক্রবার উজিরপুর গেলে কালের কণ্ঠ’র কাছে ফয়েজ চেয়ারম্যানের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তুলে ধরে তারা।

কথিত পরিষদের কাছে গেলে স্থানীয় যুবক সাইফ খান তোতা জানান, জলবাজার মোড়ে গত ১০ বছর থেকে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়। কিন্তু চেয়ারম্যান ফয়েজ আসার পর পদ্মা নদীর বেড়িবাঁধ এলাকায় তাঁর পারিবারিক জমিতে অফিসের সব কাগজপত্র নিয়ে চলে আসেন। এর পর থেকে এটিকে পরিষদ ঘোষণা করেন। প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত এখানে চলে মাদকের আড্ডা। এ ছাড়া ছিনতাই ও অপহরণ করে ভুক্তভোগীদের এখানে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হতো। তিনি আরো জানান, কিছুদিন আগে প্রকাশ্যে এলাকার অনেক মানুষের সামনে ফয়েজ চেয়ারম্যান হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমার কাছে ৪৪টি পিস্তল আছে। চারটি সব সময় আমার কাছে থাকে। বাকি ৪০টি লোকজন আমার নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করে।’ এ থেকে বোঝা যায় তিনি একজন অস্ত্র ব্যবসায়ী।

উজিরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি দুরুল হোদা জানান, গত ইউপি নির্বাচনে ভোট কারচুপি করে ফয়েজ চেয়ারম্যান হয়েছেন। তৎকালীন সংসদ সদস্য (এমপি) গোলাম রাব্বানী আর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তাঁকে ভোট কারচুপি করে চেয়ারম্যান বানিয়েছেন। আর বর্তমান এমপি ডা. শিমুল ও তাঁর ভায়ের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। ফয়েজ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। অথচ তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এসব কারণে রুবেল নামের একটি ছেলের দুই হাতের কবজি কেটে নিয়ে ছেলেটির জীবন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এসব সন্ত্রাসীর কারণে আওয়ামী লীগের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘রুবেলের দুই হাতের কবজি কাটার সঙ্গে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

উজিরপুর ইউপির সদস্য তসলিম উদ্দীন জানান, ফয়েজ চেয়ারম্যান একজন সন্ত্রাসী। এর আগে তিনি সাবেক এমপি গোলাম রাব্বানীর ছত্রচ্ছায়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। বর্তমানে এমপি ডা. শিমুলের ছত্রচ্ছায়ায় রয়েছেন। ঘটনার সময় রুবেলসহ তিনজনকে অপহরণের ঘটনা জানানো হলেও এমপি কোনো ব্যবস্থা নেননি। ঘটনা জানার পর তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নিলে রুবেলের দুটি হাত বিচ্ছিন্ন করার দুঃসাহস দেখাতে পারতেন না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের এমপি ডা. সামিল উদ্দীন আহম্মেদ শিমুল বলেন, ‘ফয়েজ ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে আমার সঙ্গে যতটুকু সম্পর্ক থাকা দরকার তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। ঘটনার দিন রাতে আমি বিষয়টি জানার পর ওই তিন ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কঠোরভাবে বলি। শুধু তা-ই না, তাদের বাড়ি পৌঁছে দিতেও বলি। এমনকি তাদের যেন কোনো প্রকার মারধর না করা হয়, সে কথাও বলি। ফয়েজ চেয়ারম্যান আমাকে কথা দেয় ছেলেগুলোকে ছেড়ে দেবে। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনি যে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আমি বিষয়টি আঁচ করতে পারলে কখনো এমনটি হতে দিতাম না। আমার সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েছে তারা। এ রকম জঘন্য অপরাধের কোনো ক্ষমা হতে পারে না। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের জন্য যা যা করা প্রয়োজন আমি তা করব।’

উল্লেখ্য, গত বুধবার রাতে ফয়েজ ও তাঁর কর্মীরা রুবেল হোসেনকে তুলে নিয়ে গিয়ে দুই হাতের কবজি কেটে ফেলে। গুরুতর আহত অবস্থায় এলাকাবাসী প্রথমে তাঁকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে ও পরে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা