kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আমন ধানে খরার হানা

কোথাও এক মাস ধরে বৃষ্টি নেই। কোথাও বৃষ্টি হলেও তা আবাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। খরায় আমন মাঠ ফেটে যাচ্ছে। এ নিয়ে আমাদের আয়োজন। লিখেছেন যথাক্রমে এমদাদুল হক মিলন, রেজাউল করিম রেজা, নূরুল ইসলাম খান ও ফিরোজ কামাল ফারুক।

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দিনাজপুর

আকাশে মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ালেও বৃষ্টি হচ্ছে না। আর মাঝেমধ্যে যে বৃষ্টি হচ্ছে এটাকে দিনাজপুরের কৃষকরা ছাগল তাড়ানো বৃষ্টি বলে আখ্যায়িত করছেন। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় আবাদি জমি পুড়ছে। জমি ফেটে চৌচির হতে শুরু করেছে।

সদর উপজেলার চুনিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক আজমল হোসেন বলেন, ‘ঠিকমতন পানি (বৃষ্টি) হয় না। এভাবে যদি চলে তাহলে তো জমি পড়ি থাকিবে, আবাদসাবাদ করা যাবে নাই।’

বৃষ্টি না হওয়ায় আমন আবাদ নিয়ে শঙ্কায় থাকায় এমন মন্তব্য শুধু  আজমল হোসেনেরই নয়, দিনাজপুর সদর উপজেলার কৃষক দয়া রাম রায়, বাবুল হোসেন, বিরল উপজেলার সোহরাব আলী, কাহারোল উপজেলা আব্দুল্লাহ, বীরগঞ্জের ইয়াছির আলীর। আজমল হোসেন জানান, তাঁর চার বিঘা জমিতে আমন আবাদ হয়। এ জন্য প্রায় ২৫ শতক জমিতে বীজতলা তৈরি করেছেন। চারাও বড় হয়েছে। পানির অভাবে রোপণ করতে পারছেন না। এ বছরই শুধু নয়, কয়েক বছর ধরেই আবহাওয়া এমন বিড়ম্বনায় ফেলছে। মেশিন দিয়ে চারা রোপণ করলে খরচ অনেক হয়ে যায়, বোরোর মতো আমনের ফলন হয় না। আর সে তুলনায় ধানের দাম পাওয়া যায় না। তাই তিনি বুঝতে পারছেন না সামনের দিনে বৃষ্টি হবে কি না।

বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রামের কৃষক মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমন আবাদের জন্য জমিতে চাষ দিয়েছি। কিন্তু এক ফোঁটা পানিও নেই। এ অবস্থায় কিভাবে আমন রোপণ করব, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ তৌহিদ ইকবাল জানান, চলতি আমন মৌসুমে জেলার ১৩টি উপজেলার দুই লাখ ৭৪ হাজার হেক্টর জমিতে সাত লাখ ৮০ হাজার টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৬২৮ হেক্টরে ৪২ হাজার টন হাইব্রিড, দুই লাখ ৬০ হাজার হেক্টরে সাত লাখ ৩৩ হাজার টন উফশী এবং তিন হাজার হেক্টর জমিতে পাঁচ হাজার ২২১ টন স্থানীয় জাতের আমন ধান উৎপাদনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দিনাজপুরের সহকারী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করছি। কিছু কিছু এলাকায় ডিপ টিউবয়েলগুলো চালু করা হয়েছে। যদি অল্প সময়ের মধ্যে বৃষ্টির দেখা না মেলে তাহলে বরেন্দ্র অঞ্চলে সম্পূরক সেচ শুরু করা হবে। ডিপ টিউবয়েলগুলো চালু করা হবে। এ জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’

 

নাটোরের লালপুরে ফেটে যাওয়া আমন ক্ষেতে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন এক কৃষক।   ছবি : কালের কণ্ঠ

নাটোর

দেশের সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাতের স্থান নাটোরের লালপুরে বৃষ্টি নেই প্রায় এক মাস। বৃষ্টির অভাবে তাই এবার কপাল পুড়েছে রোপা আমন চাষিদের। চারা রোপণের সময় কিছুটা হলেও এখন নেই বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও। ফলে রোপা আমন চাষ হুমকির মুখে পড়েছে। বৃষ্টি না হওয়ায় ধানের জমি শুকিয়ে চৌচির হতে শুরু করেছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মাজরা পোকা ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ। হাতে গোনা কয়েকজন কৃষক সম্পূরক সেচ দিলেও বেশির ভাগ কৃষক সেচের অভাবে ফসলহানির আশঙ্কা করছেন। ফলে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের আবাদ এবং লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সংশয় রয়েছে ধান চাষিদের।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় পাঁচ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে সাত হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে।

সম্প্রতি উপজেলার চকনাজিরপুর, ওয়ালিয়া, মুরদাহবিল, দুয়াড়িয়া, দুরদুরিয়া, বরমহাটি, বড়ময়নাসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, পানির অভাবে খাঁ খাঁ করছে আমনের মাঠ। চৌচির হয়ে গেছে ধানক্ষেত। কোনো কোনো জমির ধান বিবর্ণ রং ধারণ করেছে। ক্ষেতের কিছু অংশে ধান একেবারে চিটা হয়ে গেছে।

ধান চাষিরা এমন পরিস্থিতির জন্য মূলত প্রকৃতির বৈরী আচরণকে দুষছেন। তাঁদের মতে, দেশের উষ্ণতম এ স্থানে প্রতিবছর বৃষ্টিপাত কম হলেও মোটামুটি ভারসাম্য বজায় থাকে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন।

ওয়ালিয়া ইউনিয়নের ধান চাষি আশিকুর রহমান জানান, তিনি ঈদের আগে বৃষ্টির পানিতে প্রস্তুত জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছেন। এর পর থেকে আর বৃষ্টি না হওয়ায় ধানের জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। ধানে মাজরাসহ বিভিন্ন পোকার আক্রমণ বেড়েছে।

লালপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, লালপুর কম বৃষ্টিপাতের স্থান। চলতি মৌসুমে অনাবৃষ্টির কারণে কিছু জমির শুকিয়ে গেছে। কৃষকদের সম্পূরক সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

 

যশোরের কেশবপুরে বৃষ্টির অভাবে কৃষকের আমন ক্ষেত এভাবেই ফেটে যাচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

কেশবপুর

বৃষ্টির পানির অভাবে যশোরের কেশবপুরে আমন আবাদকারী কৃষকরা পড়েছেন বিপাকে। আশাতীত বৃষ্টি না হওয়ায় তাঁদের ভূগর্ভস্থ পানির সেচ নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রার বেশি আমন আবাদ হলেও সেচের ওপর নির্ভর হওয়ায় কৃষকরা স্বাভাবিক ফলন থেকে বঞ্চিত হবেন বলে জানা গেছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার কেশবপুরে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় আট হাজার ৮০০ হেক্টর। অনাবৃষ্টির কারণে কৃষকরা লক্ষ্যমাত্রা থেকেও ৪৪০ হেক্টর অতিরিক্ত আবাদ করেছেন। বৃষ্টি বেশি না হওয়ায় সেচের ওপর নির্ভর হতে হওয়ায় স্বাভাবিক ফলন থেকে কৃষকরা বঞ্চিত হবেন বলে কৃষি কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। ৯ হাজার ২৪০ হেক্টর আমন আবাদ হলেও এরই মধ্যে পাঁচ হাজার হেক্টর ক্ষেত সেচের আওতায় এসে গেছে। এর পরও বৃষ্টি না হলে পুরো আবাদই সেচের আওতায় এসে যাবে। উপজেলার বিভিন্ন বিলের কৃষকের ক্ষেতে গিয়ে দেখা গেছে, পানির অভাবে আবাদি ক্ষেত ফেটে গেছে। বিশেষ করে উঁচু জমিতে আবাদ করা কৃষকদের পড়তে হয়েছে বিপাকে। প্রচণ্ড রৌদ ও গরমে সেচ দিয়েও ক্ষেতে পানি ধরে রাখতে পারছেন না কৃষকরা। একবার সেচ দেওয়ার পর বিলম্ব হলেই ক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে।

উপজেলার পাঁজিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে আমনের আবাদ করেছেন। ক্ষেতে প্রতিবার সেচ দিতে তাঁর খরচ হচ্ছে এক হাজার টাকা।

উপজেলা কৃষ্টি কর্মকর্তা মহাদেব চন্দ্র সানা বলেন, এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও আমনের আবাদ হয়েছে বেশি। অতিরিক্ত বৃষ্টি না হওয়ায় এরই মধ্যে পাঁচ হাজার হেক্টর ক্ষেত সেচের আওতায় এসেছে। এর পরও বৃষ্টি না হলে পুরো আবাদই সেচের আওতায় এসে যাবে। সে কারণে কৃষকদের স্বাভাবিক ফলন থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

 

বগুড়ার নন্দীগ্রাম পৌরসভার রহমাননগর এলাকার মাঠে বৃষ্টির অভাবে শুকিয়ে গেছে আমন ক্ষেত।    ছবি : কালের কণ্ঠ

নন্দীগ্রাম

প্রচণ্ড দাবদাহ, বৃষ্টির জন্য হাহাকার বগুড়ার নন্দীগ্রামে উপজেলায়। খরার তীব্রতায় রোপা আমন ধানের জমি ফেটে চৌচির। ফলে ক্ষেতের ধান বাঁচানো এখন কৃষকদের জন্য দায় হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও কৃষক শ্যালো মেশিন বা বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে রোপা আমন ধানের জমিতে সেচ দিচ্ছেন।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় এবার আমন আবাদ করা হয়েছে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে। এখন ধানের থোড় (ছড়া) বের হওয়ার সময়। জমিতে সেচের প্রয়োজন। অনেকে সেচ দিয়ে ধান বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। কৃষকরা জানান, ধানের গাছ এখনো বেশ পরিপুষ্ট। তবে পানির অভাবে কোথাও কোথাও ধান গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে।

তৈয়বপুর গ্রামের বাবু মিয়া জানান, বৃষ্টির পানি না থাকায় জমি ফেটে যাচ্ছে। এখন শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিতে হবে। পানির অভাবে কিছু কিছু জমির ধান গাছ বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কৃষক আকরাম হোসেন বলেন, বৃষ্টির পানিতে রোপা আমন ধানের ফলন ভালো হয়। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় শ্যালো ও বৈদ্যুতিক মোটর চালিয়ে জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ মশিদুল হক বলেন, বৃষ্টির অভাবে আমন জমি ফেটে গেছে। এতে আমন ধানের কোনো ক্ষতি হবে না। কৃষকদের শ্যালো মেশিন বা বৈদ্যুতিক মোটর চালিয়ে জমিতে সেচ দিচ্ছেন। এ ছাড়া দাবদাহ মোকাবেলা করে আমন চাষ করার বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা